মানুষের একাকিত্ব এখন আর কেবল মনের ভেতরের নীরব কষ্ট নয়, বরং ডিজিটাল মাধ্যমে এটি অপরাধীদের নতুন হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। কারো কথা বলার মানুষের প্রয়োজন, কারো কয়েক ঘণ্টার সাহচর্য দরকার, আবার কেউ বিদেশ থেকে দেশের কারো সাথে নিয়মিত যোগাযোগের তাগিদ অনুভব করছেন।
সেই চাহিদাকেই পুঁজি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আড়ালে তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য বাজার— যেখানে বন্ধুত্বেরও দাম নির্ধারিত হচ্ছে। বন্ধুত্বের দাম ঘণ্টায় ২০০ থেকে ৫০০ টাকা। অথচ ব্যবহারকারীরা জানছেনও না, তার এই সার্ভিস নেওয়ার কারণে বা চ্যাট, ভিডিও কল ও ভার্চুয়াল সঙ্গের আড়ালে তিনি তথ্য হাতানো, অর্থ হারানো, প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ঝুঁকি বহন করছেন।
এমনটা ঘটছেও অহরহ। কয়েকজন ব্যবহারকারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের চার্জের পরিমাণ ঘণ্টায় ২০০ থেকে ৫০০ টাকা। কখনো দৈনিক চুক্তি। কোথাও অগ্রিম টাকা। কোথাও মোবাইল রিচার্জ। আবার কোথাও ভার্চুয়াল কয়েন বা ডিজিটাল গিফট। বিনিময়ে কথা বলা, চ্যাট করা কিংবা ‘ভার্চুয়াল ফ্রেন্ড’ হয়ে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি। অনেকে সুবিধা পাচ্ছেন।
তবে অধিকাংশই হচ্ছেন প্রতারিত। বাংলাদেশে এ ধরনের ‘পেইড ফ্রেন্ডশিপে’র কোনো স্বীকৃত বা নিয়ন্ত্রিত প্রাতিষ্ঠানিক বাজার নেই। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অর্থের বিনিময়ে বন্ধুত্ব বা কথা বলার প্রস্তাবের উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে প্রতিবেদনের অনুসন্ধানী উপকরণে।
আর এই অনানুষ্ঠানিক সম্পর্কের সবচেয়ে অন্ধকার দিকটি হলো— বন্ধুত্বের দরজা দিয়ে ঢুকে ব্যক্তিগত জীবনের গোপন দরজা খুলে ফেলা। রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আসিফ ইকবাল। দীর্ঘদিনের একাকিত্ব থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গ্রুপে যুক্ত হন তিনি। সেখানে পরিচয় হয় এক তরুণীর সঙ্গে। কথা বলা ও চ্যাটিংয়ের জন্য দৈনিক ৫০০ টাকার বিনিময়ে ‘ভার্চুয়াল ফ্রেন্ড’ হওয়ার প্রস্তাবে রাজি হন তিনি।
প্রথমদিকে সম্পর্ক স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু মাসখানেক পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ভিডিও কলে কথোপকথনের কিছু অংশ গোপনে ধারণ করে টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। তিনি শেষ পর্যন্ত টাকা দিয়ে বন্ধুত্বের ইতি টানেন। বন্ধুত্ব যেখানে তাকে সঙ্গ দেওয়ার কথা, সেখানে সেটিই হয়ে ওঠে সম্ভ্রম হারানোর হাতিয়ার।
অবসরপ্রাপ্ত পুলিশের ডিআইজি ইমতিয়াজ উদ্দিন আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, র‌্যাব ও পুলিশে থাকাকালে তিনি এ ধরনের অনেক অভিযোগ পেয়েছেন। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নিজেই অনেক সময় অপরিচিত ব্যক্তিকে বিশ্বাস করে ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে থাকেন। কোথায় চাকরি করেন, কোথায় থাকেন, পরিবারে কে কে আছেন, কার সঙ্গে সম্পর্ক কেমন— কথার ফাঁকে ফাঁকে এসব তথ্য বের করে নেয় প্রতারকেরা।
এরপর ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা কথোপকথনের স্ক্রিনশট হয়ে ওঠে ব্ল্যাকমেইলের উপকরণ। তিনি আরও বলেন, কখনো আবার শুরু থেকেই উদ্দেশ্য থাকে প্রতারণা। বলা হয়, ‘বন্ধুত্ব করতে চাইলে আগে ফি দিতে হবে। ’ টাকা পাওয়ার পর অ্যাকাউন্ট বন্ধ। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ভুক্তভোগীর কাছে তখন থাকে শুধু একটি মোবাইল নম্বর, একটি অনলাইন আইডি এবং হারানো টাকা।
এই বাজারের কোনো দোকান নেই। নেই সাইনবোর্ড। নেই অফিস। নেই চুক্তিপত্র। অথচ লেনদেন হচ্ছে মোবাইল ফোনে, পরিচয় তৈরি হচ্ছে কয়েক মিনিটে এবং সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে এক ক্লিকেই। ফেসবুক ও টেলিগ্রামের বিভিন্ন গ্রুপে ‘ভার্চুয়াল ফ্রেন্ড’, ‘চ্যাট পার্টনার’ কিংবা নিঃসঙ্গতা দূর করার মতো শব্দ ব্যবহার করে যোগাযোগের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
লাইভ স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম বিগো লাইভ, লাইকি এবং ট্যাংগোতে ভার্চুয়াল কয়েন, ডায়মন্ড বা গিফটের মাধ্যমে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়। আবার টিন্ডার, বু কিংবা টান টান-এর মতো ডেটিং বা সামাজিক যোগাযোগের অ্যাপেও ব্যক্তিগতভাবে অর্থের বিনিময়ে দীর্ঘ সময় কথা বলা বা ভার্চুয়াল সম্পর্কের প্রস্তাব আসে। তবে এসব অ্যাপ নিজেরাই এমন প্রতারণামূলক সেবা দেয়— এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
ঝুঁকিটি তৈরি হয় ব্যবহারকারীদের অপব্যবহার ও অপরাধীদের কার্যক্রমে। প্রশ্ন হচ্ছে, কারা এর শিকার? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, শুধু তরুণেরা নয়। একাকী প্রবীণ, অবসরপ্রাপ্ত মানুষ, প্রবাসী, সম্পর্কের সংকটে থাকা ব্যক্তি কিংবা সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়া যে কেউ এ ধরনের প্রস্তাবে আকৃষ্ট হতে পারেন।
তরুণদের ক্ষেত্রে কৌতূহল বা আবেগ কাজ করতে পারে; প্রবীণদের ক্ষেত্রে কাজ করতে পারে কথা বলার প্রয়োজন। প্রবাসীদের ক্ষেত্রে কাজ করতে পারে দেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের আকাঙ্ক্ষা; অর্থাৎ অপরাধীদের টার্গেট করার মূল জায়গাটি বয়স নয়— মানুষের দুর্বল মুহূর্ত। অপরাধ বিশ্লেষক ও গবেষক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী মনে করেন, একাকিত্ব মানুষের বিচারবোধকে দুর্বল করে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তার মতে, মানুষের মানসিক প্রয়োজন কাজে লাগিয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতারণা করা একধরনের ‘সাইকো-ডিজিটাল ক্রাইম’। প্রখ্যাত আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোশারফ হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ছদ্মনামে গড়ে ওঠা অনলাইন ‘পেইড ফ্রেন্ডশিপ’ অনেক সময় বড় ধরনের অপরাধের ফাঁদ হতে পারে। প্রথমে স্বাভাবিক যোগাযোগ ও লেনদেন দিয়ে বিশ্বাস তৈরি করে পরে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করার ঝুঁকি রয়েছে।
এখানে অপরাধের কৌশলটিও বদলে যাচ্ছে। আগে প্রতারণার জন্য অপরাধীকে সামনে আসতে হতো। এখন তাকে সামনে আসতেই হচ্ছে না। একটি ভুয়া প্রোফাইল, একটি মোবাইল নম্বর এবং কয়েকটি বিশ্বাসযোগ্য কথাই যথেষ্ট। আর একবার বিশ্বাস তৈরি হলে শুরু হয় তথ্য সংগ্রহ। প্রথম ধাপে ব্যক্তিগত তথ্য। দ্বিতীয় ধাপে ছবি বা ভিডিও। তৃতীয় ধাপে আবেগ। চতুর্থ ধাপে অর্থ।
শেষ ধাপে ভয়। ভুক্তভোগী টাকা দিলে দাবি বাড়তে থাকে। টাকা না দিলে শুরু হয় প্রকাশের হুমকি। অনেকেই সামাজিক সম্মান বা পরিবারের ভয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে যেতে চান না। ফলে অপরাধী আরও সাহসী হয়ে ওঠে। এই নীরবতাই অপরাধীদের সবচেয়ে বড় শক্তি। মোশারফ হোসেন বলেন, অনলাইনে পরিচিত-অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল তথ্য শেয়ার করা যাবে না।
জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক তথ্য, ওটিপি, পাসওয়ার্ড, ব্যক্তিগত ছবি কিংবা ভিডিও কখনোই অপরিচিত কারো হাতে দেওয়া উচিত নয়। অর্থের বিনিময়ে ‘বন্ধুত্ব’ বা ‘চ্যাটিং’-এর প্রস্তাব এলেই সেটিকে বৈধ বা নিরাপদ ধরে নেওয়ারও কারণ নেই। আর যদি কেউ ব্ল্যাকমেইলের শিকার হন, তাহলে আতঙ্কে প্রমাণ মুছে ফেলা বা দাবি করা টাকা দিয়ে দেওয়া ঠিক নয়; বরং সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের লিংক, মোবাইল নম্বর, কথোপকথনের স্ক্রিনশট, লেনদেনের তথ্য ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ মো. মোস্তফা কামালের মতে, শুধু পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ অপরাধের শিকড় অনেক গভীরে— একাকিত্বে। একই শহরে লাখো মানুষের বসবাস, অথচ অনেকেই দিনের শেষে কথা বলার মতো একজন মানুষ খুঁজে পান না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো ‘বন্ধু’, কিন্তু বাস্তবে পাশে থাকার মানুষ নেই।
পরিবারের সদস্যরা একই ঘরে থেকেও আলাদা স্ক্রিনে ব্যস্ত। সন্তান বিদেশে, বাবা-মা একা। কর্মব্যস্ত জীবনে বন্ধুত্বও অনেক সময় ভার্চুয়াল। এই বাস্তবতাই তৈরি করছে নতুন এক সামাজিক শূন্যতা। আর সেই শূন্যতার জায়গায় ঢুকে পড়ছে ব্যবসা। বন্ধুত্বের বিনিময়ে টাকা নেওয়াই অপরাধ— এমন সরল সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কিন্তু যখন পরিচয় গোপন রেখে অর্থ নেওয়া, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, প্রতারণা কিংবা ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে মানুষের একাকিত্বকে ব্যবহার করা হয়, তখন সেটি নিছক বন্ধুত্বের বিষয় থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে সাইবার অপরাধের ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র। তাই বন্ধুত্ব গড়ে তোলার আগে অধিকতর সতর্ক হওয়া দরকার। এখন প্রশ্ন শুধু ‘ভাড়ায় বন্ধু’ আছে কি না, তা নয়।
প্রশ্ন হলো— কেন মানুষ বন্ধুত্ব কিনতে চাইছে? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, এই একাকিত্বের দাম শেষ পর্যন্ত কে দিচ্ছে? কেউ দিচ্ছেন টাকা। কেউ হারাচ্ছেন ব্যক্তিগত গোপনীয়তা। কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। আবার কেউ হয়তো ভয়েই কাউকে কিছু বলতে পারছেন না। ডিজিটাল যুগে বন্ধুত্ব হয়তো পর্দার ওপার থেকেও আসতে পারে। কিন্তু সেই পর্দার ওপারে কে আছে— তা না জেনে নিজের জীবনের দরজা খুলে দেওয়া যে কতটা বিপজ্জনক, ‘ভাড়ায় বন্ধুত্বে’র অন্ধকার দিকটি এখন সেটিই সামনে আনছে।



















