1:01 am, Monday, 10 August 2026

ধ্বংসের মুখে মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান

  • MIT ERP
  • Update Time : 11:01:55 pm, Sunday, 9 August 2026
  • 4

ধ্বংসের মুখে মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

সবুজের সমারোহে ঘেরা মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এখন রীতিমতো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। গাছচোরদের দৌরাত্ম্য, মাত্রাতিরিক্ত পর্যটক সমাগম আর বনের বুক চিরে চলা সড়কে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের হর্ন- সব মিলিয়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই চিরহরিৎ বন ধুঁকে ধুঁকে ধ্বংস হচ্ছে।

গাছচোরদের তৎপরতার পাশাপাশি অবৈধভাবে ভূমি দখলের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে এই উদ্যানের বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানটি কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত। এটি পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনের একটি অংশ। এর আয়তন প্রায় ১২৫০ হেক্টর বা ১২ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার। তবে এই উদ্যান প্রায় ২৭ দশমিক ৪ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত সংরক্ষিত বনের কেন্দ্রে অবস্থিত।

একসময় যেখানে পাতার ফাঁক গলে সহজেই চোখে পড়ত বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের ঝাঁক। এখন সেখানে টিকে আছে কেবল বানর, অজগর আর বুনো শূকর। বন বিভাগের খাতায় এখনো লেখা আছে ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণীর কথা। এর মধ্যে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ছয় প্রজাতির সরীসৃপ ও চার প্রজাতির উভচর প্রাণী। কিন্তু বাস্তবে লাউয়াছড়ায় বনের ভেতরে ঠিক কী পরিমাণ প্রাণী অবশিষ্ট আছে, তা জানা নেই খোদ বন বিভাগেরই।

শুধু তাই নয়, প্রায় ৩০ বছর আগে লাউয়াছড়াকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করার পর এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট ভূমি জরিপ বা স্থায়ী সীমানাপ্রাচীর চিহ্নিত করা হয়নি। ফলে চারপাশে চা-বাগান এবং অবৈধ দখলদারদের কারণে বনের সীমানা দিনে দিনে সংকুচিত হচ্ছে। এই উদ্যানে দিনে দিনে গাছচোরদের তৎপরতা বাড়ছে। পাশাপাশি নানা দুর্বলতার সুযোগে বাড়ছে অবৈধ দখলদারও।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বন রক্ষা করার দায়িত্বে নিয়োজিতদের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই বাড়ছে ধ্বংসযজ্ঞ। ফলদ গাছ এবং বড় গাছ কমে যাওয়ায় প্রাণীরা তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে। বনের পরিবেশ বিপন্ন হওয়ায় অজগর, বানরসহ বিভিন্ন প্রাণী প্রায়ই লোকালয়ে চলে আসছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, জাতীয় উদ্যান ঘোষণার আড়াই যুগ পার হলেও লাউয়াছড়া আজও দাঁড়িয়ে আছে অরক্ষিত অবস্থায়- সীমানাহীন, নিয়ন্ত্রণহীন আর ক্রমাগত ক্ষয়িষ্ণু।

এখনো এই জাতীয় উদ্যানের সীমানা নির্ধারণ করা হয়নি। এই সুযোগে ক্রমেই দখল হয়ে যাচ্ছে বনভূমি। কেউ কেউ দখলি জমিতে গড়ে তুলেছেন বাগানও। মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও সীমানা চিহ্নিত না থাকায় তা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে সিলেট জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার মোহাম্মদ ফারুক আহমদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, জরিপসংক্রান্ত একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খুব শিগগির সীমানা নির্ধারণ করে পিলার বসানোর কাজ শুরু হবে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ একটি চক্র উদ্যানের বিভিন্ন এলাকা থেকে সেগুন, আগর, আকাশমণি, চাম্বলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মূল্যবান গাছ কেটে ট্রাকযোগে দেশের নানা প্রান্তে পাচার করছে। সম্প্রতি উদ্যানের প্রধান ফটক থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতরে গিয়ে অন্তত ১৫-১৬টি গাছের কাটা গোড়া দেখা যায়।

পাশাপাশি গভীর জঙ্গলে ঝড়ে উপড়ে পড়া প্রায় শতবর্ষী দুটি সেগুনগাছও নজরে আসে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সংরক্ষিত এলাকা লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান থেকে নিয়মিত গাছ ও বাঁশ পাচার হচ্ছে। বনদস্যুরা বনরক্ষীদের ম্যানেজ করে প্রতিদিন নির্দ্বিধায় বনে প্রবেশ করছে। পাহাড়ি বনাঞ্চল ও বাঁশমহালগুলোতে চলছে সম্পদ লুটের মহোৎসব। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি লাউয়াছড়ার ভেতরেই অর্ধশতাধিক গাছ চুরির চিহ্ন পাওয়া গেছে।

এতে বন বিভাগের নজরদারি ও দায়িত্ব পালনের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গত এপ্রিল মাসে লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বন থেকেও একই কৌশলে বাঁশ পাচারের অভিযোগ ওঠে। এরপর জুন মাসে লাউয়াছড়া থেকে সেগুন, আগর, আকাশমণি, চাম্বলসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ট্রাকযোগে পাচারের অভিযোগ সামনে আসে। ঘটনাগুলোর ধরন, ব্যবহৃত কৌশল এবং অভিযুক্তদের ব্যাখ্যায় বিস্ময়কর মিল থাকায় পরিবেশসংশ্লিষ্টদের ধারণা, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কর্মকাণ্ড।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ ছাড়া এভাবে বছরের পর বছর বনজ সম্পদ পাচার সম্ভব নয়। দুর্গমতার কারণে এসব এলাকায় বন বিভাগের নজরদারি সহজে পৌঁছায় না বলে স্থানীয়দের একাংশের সহযোগিতায় বছরের পর বছর ধরে চলছে এই লুটপাট। তারা জানান, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশেই মূলত এই পাচার সম্ভব হয়।

তাদের ভাষ্য, বৃষ্টির পর ছড়ায় স্রোত বাড়লে নৌপথে সহজেই বাঁশ পাচার হয়ে যায়। আর বছরের বাকি সময় রাতের আঁধারে চলে গাছ কাটা। এমনকি জনবহুল সড়কের পাশ থেকেও গাছ চুরি হলেও বন বিভাগের ভূমিকা থাকে অনেকটাই নীরব দর্শকের- এমন অভিযোগও উঠেছে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে। অভিযোগের বিষয়ে লাউয়াছড়া বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. নাজমুল হক দাবি করেন, প্রতিদিন টহল জোরদার রয়েছে এবং কাঠ পাচারের কোনো সুযোগ নেই।

প্রতি মাসে চার-পাঁচটি মামলাও দায়ের করা হয়। তবে রাজকান্দি রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) তানভীর আহমেদ স্বীকার করেন, বনাঞ্চল অত্যন্ত বিস্তৃত হলেও তুলনামূলকভাবে লোকবল ও লজিস্টিক সহায়তা অনেক কম। কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান জানান, গাছ কাটার বিষয়টি কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। বন বিভাগকে সঙ্গে নিয়ে সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা মিললে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, লাউয়াছড়ায় বনের ভেতর দিয়ে চলে গেছে সড়ক ও রেলপথ, যেখানে সর্বোচ্চ গতিসীমা ২০ কিলোমিটার নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ নেই। দিন-রাত গাড়ি ও ট্রেন চলাচলের কারণে প্রতিনিয়ত প্রাণী দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। সড়কে গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে সাপ, বানর, শিয়াল, বন্য শূকর, গুঁইসাপসহ নানা প্রাণী। বৈদ্যুতিক লাইনের সংস্পর্শে এসেও মারা যাচ্ছে অনেক প্রাণী।

সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম বলেন, বন ধ্বংস করা যায়, কিন্তু বন পুনরুদ্ধার করা যায় না। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও প্রকৃতি বিশেষজ্ঞ ড. তপন কুমার দে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, লাউয়াছড়াকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণার আগে থেকেই এর মধ্য দিয়ে ট্রেন লাইন চালু ছিল। প্রায়ই ট্রেনে কাটা পড়ে কিংবা সড়কে যানবাহনের নিচে চাপা পড়ে বন্যপ্রাণী মারা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী পারাপারের জন্য ছোট ছোট ঝুলন্ত সেতু কিংবা আন্ডারপাস করা যেতে পারে। সূত্র জানায়, ঈদসহ বিভিন্ন ছুটিতে উদ্যানে ভিড় করেন অতিরিক্ত পর্যটক। যাদের বড় অংশই টিকিট ছাড়াই প্রবেশ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বনের চারপাশ খোলা থাকায় সহজেই ভেতরে ঢুকে পড়া এসব পর্যটকের একাংশ নির্দেশনা উপেক্ষা করে যত্রতত্র বর্জ্য ফেলছেন এবং হইহুল্লোড় করছেন, যাতে ব্যাহত হচ্ছে প্রাণীদের স্বাভাবিক পরিবেশ।

শুষ্ক মৌসুমে ছড়া শুকিয়ে যাওয়ায় পানি ও খাদ্য সংকটে পড়ে অনেক প্রাণী লোকালয়মুখী হচ্ছে এবং কখনো কখনো মানুষের আঘাতে প্রাণ হারাচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

সৌদি আরবে সোফা কারখানায় আগুনে ১৭ বাংলাদেশির মৃত্যু: ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত

ধ্বংসের মুখে মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান

Update Time : 11:01:55 pm, Sunday, 9 August 2026

সবুজের সমারোহে ঘেরা মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এখন রীতিমতো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। গাছচোরদের দৌরাত্ম্য, মাত্রাতিরিক্ত পর্যটক সমাগম আর বনের বুক চিরে চলা সড়কে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের হর্ন- সব মিলিয়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই চিরহরিৎ বন ধুঁকে ধুঁকে ধ্বংস হচ্ছে।

গাছচোরদের তৎপরতার পাশাপাশি অবৈধভাবে ভূমি দখলের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে এই উদ্যানের বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানটি কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত। এটি পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনের একটি অংশ। এর আয়তন প্রায় ১২৫০ হেক্টর বা ১২ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার। তবে এই উদ্যান প্রায় ২৭ দশমিক ৪ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত সংরক্ষিত বনের কেন্দ্রে অবস্থিত।

একসময় যেখানে পাতার ফাঁক গলে সহজেই চোখে পড়ত বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের ঝাঁক। এখন সেখানে টিকে আছে কেবল বানর, অজগর আর বুনো শূকর। বন বিভাগের খাতায় এখনো লেখা আছে ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণীর কথা। এর মধ্যে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ছয় প্রজাতির সরীসৃপ ও চার প্রজাতির উভচর প্রাণী। কিন্তু বাস্তবে লাউয়াছড়ায় বনের ভেতরে ঠিক কী পরিমাণ প্রাণী অবশিষ্ট আছে, তা জানা নেই খোদ বন বিভাগেরই।

শুধু তাই নয়, প্রায় ৩০ বছর আগে লাউয়াছড়াকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করার পর এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট ভূমি জরিপ বা স্থায়ী সীমানাপ্রাচীর চিহ্নিত করা হয়নি। ফলে চারপাশে চা-বাগান এবং অবৈধ দখলদারদের কারণে বনের সীমানা দিনে দিনে সংকুচিত হচ্ছে। এই উদ্যানে দিনে দিনে গাছচোরদের তৎপরতা বাড়ছে। পাশাপাশি নানা দুর্বলতার সুযোগে বাড়ছে অবৈধ দখলদারও।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বন রক্ষা করার দায়িত্বে নিয়োজিতদের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই বাড়ছে ধ্বংসযজ্ঞ। ফলদ গাছ এবং বড় গাছ কমে যাওয়ায় প্রাণীরা তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে। বনের পরিবেশ বিপন্ন হওয়ায় অজগর, বানরসহ বিভিন্ন প্রাণী প্রায়ই লোকালয়ে চলে আসছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, জাতীয় উদ্যান ঘোষণার আড়াই যুগ পার হলেও লাউয়াছড়া আজও দাঁড়িয়ে আছে অরক্ষিত অবস্থায়- সীমানাহীন, নিয়ন্ত্রণহীন আর ক্রমাগত ক্ষয়িষ্ণু।

এখনো এই জাতীয় উদ্যানের সীমানা নির্ধারণ করা হয়নি। এই সুযোগে ক্রমেই দখল হয়ে যাচ্ছে বনভূমি। কেউ কেউ দখলি জমিতে গড়ে তুলেছেন বাগানও। মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও সীমানা চিহ্নিত না থাকায় তা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে সিলেট জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার মোহাম্মদ ফারুক আহমদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, জরিপসংক্রান্ত একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খুব শিগগির সীমানা নির্ধারণ করে পিলার বসানোর কাজ শুরু হবে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ একটি চক্র উদ্যানের বিভিন্ন এলাকা থেকে সেগুন, আগর, আকাশমণি, চাম্বলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মূল্যবান গাছ কেটে ট্রাকযোগে দেশের নানা প্রান্তে পাচার করছে। সম্প্রতি উদ্যানের প্রধান ফটক থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতরে গিয়ে অন্তত ১৫-১৬টি গাছের কাটা গোড়া দেখা যায়।

পাশাপাশি গভীর জঙ্গলে ঝড়ে উপড়ে পড়া প্রায় শতবর্ষী দুটি সেগুনগাছও নজরে আসে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সংরক্ষিত এলাকা লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান থেকে নিয়মিত গাছ ও বাঁশ পাচার হচ্ছে। বনদস্যুরা বনরক্ষীদের ম্যানেজ করে প্রতিদিন নির্দ্বিধায় বনে প্রবেশ করছে। পাহাড়ি বনাঞ্চল ও বাঁশমহালগুলোতে চলছে সম্পদ লুটের মহোৎসব। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি লাউয়াছড়ার ভেতরেই অর্ধশতাধিক গাছ চুরির চিহ্ন পাওয়া গেছে।

এতে বন বিভাগের নজরদারি ও দায়িত্ব পালনের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গত এপ্রিল মাসে লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বন থেকেও একই কৌশলে বাঁশ পাচারের অভিযোগ ওঠে। এরপর জুন মাসে লাউয়াছড়া থেকে সেগুন, আগর, আকাশমণি, চাম্বলসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ট্রাকযোগে পাচারের অভিযোগ সামনে আসে। ঘটনাগুলোর ধরন, ব্যবহৃত কৌশল এবং অভিযুক্তদের ব্যাখ্যায় বিস্ময়কর মিল থাকায় পরিবেশসংশ্লিষ্টদের ধারণা, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কর্মকাণ্ড।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ ছাড়া এভাবে বছরের পর বছর বনজ সম্পদ পাচার সম্ভব নয়। দুর্গমতার কারণে এসব এলাকায় বন বিভাগের নজরদারি সহজে পৌঁছায় না বলে স্থানীয়দের একাংশের সহযোগিতায় বছরের পর বছর ধরে চলছে এই লুটপাট। তারা জানান, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশেই মূলত এই পাচার সম্ভব হয়।

তাদের ভাষ্য, বৃষ্টির পর ছড়ায় স্রোত বাড়লে নৌপথে সহজেই বাঁশ পাচার হয়ে যায়। আর বছরের বাকি সময় রাতের আঁধারে চলে গাছ কাটা। এমনকি জনবহুল সড়কের পাশ থেকেও গাছ চুরি হলেও বন বিভাগের ভূমিকা থাকে অনেকটাই নীরব দর্শকের- এমন অভিযোগও উঠেছে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে। অভিযোগের বিষয়ে লাউয়াছড়া বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. নাজমুল হক দাবি করেন, প্রতিদিন টহল জোরদার রয়েছে এবং কাঠ পাচারের কোনো সুযোগ নেই।

প্রতি মাসে চার-পাঁচটি মামলাও দায়ের করা হয়। তবে রাজকান্দি রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) তানভীর আহমেদ স্বীকার করেন, বনাঞ্চল অত্যন্ত বিস্তৃত হলেও তুলনামূলকভাবে লোকবল ও লজিস্টিক সহায়তা অনেক কম। কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান জানান, গাছ কাটার বিষয়টি কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। বন বিভাগকে সঙ্গে নিয়ে সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা মিললে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, লাউয়াছড়ায় বনের ভেতর দিয়ে চলে গেছে সড়ক ও রেলপথ, যেখানে সর্বোচ্চ গতিসীমা ২০ কিলোমিটার নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ নেই। দিন-রাত গাড়ি ও ট্রেন চলাচলের কারণে প্রতিনিয়ত প্রাণী দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। সড়কে গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে সাপ, বানর, শিয়াল, বন্য শূকর, গুঁইসাপসহ নানা প্রাণী। বৈদ্যুতিক লাইনের সংস্পর্শে এসেও মারা যাচ্ছে অনেক প্রাণী।

সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম বলেন, বন ধ্বংস করা যায়, কিন্তু বন পুনরুদ্ধার করা যায় না। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও প্রকৃতি বিশেষজ্ঞ ড. তপন কুমার দে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, লাউয়াছড়াকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণার আগে থেকেই এর মধ্য দিয়ে ট্রেন লাইন চালু ছিল। প্রায়ই ট্রেনে কাটা পড়ে কিংবা সড়কে যানবাহনের নিচে চাপা পড়ে বন্যপ্রাণী মারা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী পারাপারের জন্য ছোট ছোট ঝুলন্ত সেতু কিংবা আন্ডারপাস করা যেতে পারে। সূত্র জানায়, ঈদসহ বিভিন্ন ছুটিতে উদ্যানে ভিড় করেন অতিরিক্ত পর্যটক। যাদের বড় অংশই টিকিট ছাড়াই প্রবেশ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বনের চারপাশ খোলা থাকায় সহজেই ভেতরে ঢুকে পড়া এসব পর্যটকের একাংশ নির্দেশনা উপেক্ষা করে যত্রতত্র বর্জ্য ফেলছেন এবং হইহুল্লোড় করছেন, যাতে ব্যাহত হচ্ছে প্রাণীদের স্বাভাবিক পরিবেশ।

শুষ্ক মৌসুমে ছড়া শুকিয়ে যাওয়ায় পানি ও খাদ্য সংকটে পড়ে অনেক প্রাণী লোকালয়মুখী হচ্ছে এবং কখনো কখনো মানুষের আঘাতে প্রাণ হারাচ্ছে।