দিনে যে পাহাড়ে পাখির ডাক শোনা যায়, গভীর রাতে সেখানে ভেসে আসে চাপা ফিসফাস। চা-বাগানের আঁকাবাঁকা পথ, ঘন জঙ্গল আর পাহাড়ি ছড়াগুলো অন্ধকার নামতেই পরিণত হয় অদৃশ্য করিডোরে। ওপারে ভারতের ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়। এপারে মৌলভীবাজারের বড়লেখা, কুলাউড়া, জুড়ী, কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল। সীমান্তের দুই পাশে কড়া পাহারা থাকলেও থেমে নেই মাদক ও চোরাইপণ্য পাচারচক্রের কর্মযজ্ঞ।
সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে এর কৌশল। শক্তিশালী হয়েছে নেটওয়ার্ক। একসময় চোরাচালান নির্ভর করত কয়েকজন বাহকের ওপর। এখন সেটি রূপ নিয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটে। মোবাইল অ্যাপ, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং, লোকেশন শেয়ারিং, স্থানীয় দালাল, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে চোরাচালানের অদৃশ্য সাম্রাজ্য।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে চোরাচালান এখন আর কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়। এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। রাত তখন গভীর। কুলাউড়ার শরীফপুর সীমান্তের ওপারে ভারতীয় ভূখণ্ডে জ্বলছে বিএসএফ ক্যাম্পের আলো। সীমান্তঘেঁষা সড়কে টহল গাড়ির শব্দ। অন্যদিকে এপারে বাংলাদেশের অংশজুড়ে ঘন জঙ্গল, দুর্গম পাহাড়ি পথ আর নিকষ অন্ধকার।
সেই অন্ধকারই চোরাকারবারিদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। শুধু শরীফপুর সীমান্ত এলাকাই নয়, মৌলভীবাজারের পাঁচ উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত ২৭১ দশমিক ৮৮ কিলোমিটার সীমান্তের বড় অংশই দুর্গম ও অরক্ষিত। বহু এলাকায় সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছানোর মতো সড়কও নেই। কোথাও ঘন বন, কোথাও চা-বাগানের ভেতর সরু পথ। আবার কোথাও সীমান্ত চিহ্নিত করাই কঠিন। এই ভৌগোলিক বাস্তবতাকেই সবচেয়ে বড় সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সীমান্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এই সুযোগে প্রতিনিয়ত ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢুকছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদক। এ ছাড়া আসছে অস্ত্র, বিস্ফোরক ও চোরাইপণ্য। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হচ্ছে বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী। সীমান্তরক্ষীরা অভিযান চালালেই মুহূর্তে জঙ্গলে কিংবা পাহাড়ি পথের আড়ালে গা ঢাকা দেয় চোরাকারবারিরা।
অভিযোগ রয়েছে, শ্রীমঙ্গলের আশিদ্রোন ইউনিয়নের জঙ্গলবাড়ি ও হুসনাবাদ সীমান্ত এলাকা দিয়ে দেদার প্রবেশ করছে ভারতীয় মাদকসহ বিভিন্ন চোরাইপণ্য। এসব পণ্য ব্যবহারে চা-শ্রমিকদের ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে চোরাকারবারিরা। জঙ্গলবাড়ি ও হুসনাবাদ সীমান্ত সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, এই এলাকায় ভোর, দুপুর ও সন্ধ্যা- এই তিন সময়কে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ মনে করে চোরাকারবারিরা।
এ ছাড়া গভীর রাতেও চলে চোরাইপণ্য আদান-প্রদান। স্থানীয়দের ভাষ্য, চা-বাগানের শ্রমিকদের ব্যবহার করে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে দ্রুত এসব পণ্য শহরে পাঠানো হয়। দীর্ঘদিন ধরেই এই কৌশলেই চলছে চোরাই-বাণিজ্য। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দুর্গম এলাকা হওয়ায় এই সীমান্ত এলাকায় যাতায়াতে এবং অভিযানে চরম বেগ পেতে হয়। পথে পথে চোরাচালানিদের সোর্স নিয়োজিত থাকায় অভিযানের আগেই খবর পৌঁছে যায় ক্যারিয়ারদের কাছে।
স্থানীয় পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির পরও এই পথে চোরাচালান রুখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি বিদেশি মদ বহনকারী একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ অমিত সতনামি নামে এক ক্যারিয়ারকে জনতার সহায়তায় আটক করে শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশ। এর আগে ১৩ জুলাই মৌলভীবাজার সদর উপজেলার রাধানগর এলাকায় পর্দা টাঙানো একটি অটোরিকশা সন্দেহজনকভাবে আটক করে মাদকবিরোধী দলের সদস্যরা।
অটোরিকশাটি তল্লাশি করে ১৭ কার্টন বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে মাদক ও চোরাইপণ্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভারতীয় অংশে বহু আগেই সীমান্তজুড়ে নির্মাণ করা হয়েছে কাঁটাতারের বেড়া এবং সীমান্ত সড়ক। ফলে বিএসএফ অল্প সময়েই দুর্গম এলাকায় পৌঁছে টহল দিতে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের বহু সীমান্ত এলাকায় এখনো নেই সীমান্ত সড়ক কিংবা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। বিজিবির একাধিক ক্যাম্প থেকে কিছু সীমান্ত পয়েন্টে পৌঁছাতে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সময়ের ব্যবধানই চোরাকারবারিদের নিরাপদ করিডোর তৈরি করে দিচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজিবির এক কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমরা নিয়মিত টহল দিচ্ছি।
কিন্তু অনেক পয়েন্ট এতটাই দুর্গম যে, সেখানে পৌঁছাতেই কয়েক ঘণ্টা লেগে যায়। সীমান্ত সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। কুলাউড়া, কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলের ১১৫ কিলোমিটার সীমান্তের দায়িত্বে থাকা বিজিবি-৪৬ ব্যাটালিয়ন এবং জুড়ী ও বড়লেখা এলাকার দায়িত্বে থাকা বিজিবি-৫২ ব্যাটালিয়ন নিয়মিত অভিযান চালিয়ে ইয়াবা, বিদেশি মদ, নিষিদ্ধ সিগারেট, গরু-মহিষ, কাপড়, মোবাইল যন্ত্রাংশ, গোলাবারুদসহ বিপুল পরিমাণ চোরাইপণ্য জব্দ করছে।
তবে সম্প্রতি অস্ত্র পাচারের ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত ২৫ জুন বড়লেখার ডিমাই সীমান্তে অভিযান চালিয়ে বিজিবি তিনটি বিদেশি পিস্তল, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক ও ডেটোনেটর উদ্ধার করে। এর আগে ১৩ জুন বড়লেখা সীমান্তে টহলরত বিজিবির ওপর হামলার চেষ্টার সময় দুই ভারতীয় চোরাকারবারির একজন গুলিবিদ্ধ হয়। কুলাউড়ার শরীফপুর সীমান্তের বাসিন্দাদের দাবি, রাতে ও ভোরে এই সীমান্ত দিয়ে নিয়মিত ইয়াবা, বিদেশি সিগারেট, বিড়ি, জিরা, চিনি ও বিভিন্ন চোরাইপণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেলেই চোরাকারবারিরা দুর্গম এলাকা দিয়ে দ্রুত সটকে পড়ে। বিজিবি-৫২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আতাউর রহমান সুজন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, জুড়ী, বড়লেখা ও কুলাউড়াসহ বেশ কয়েকটি সীমান্ত এলাকা অত্যন্ত দুর্গম। এই সুযোগে অবৈধ পণ্য প্রবেশ করছে। আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি, মামলাও করছি।
তবে দীর্ঘমেয়াদে সীমান্ত সড়ক ও অবকাঠামো ছাড়া এই প্রবণতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। সীমান্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ভারত থেকে বাংলাদেশে আসছে গরু, ফেনসিডিল, বিভিন্ন ধরনের মাদক, কসমেটিকস, শাড়ি, কাপড়, মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ, নিষিদ্ধ ওষুধ ও ভোগ্যপণ্য। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচার হচ্ছে স্বর্ণ, সার, সিগারেট, মাছ, কৃষিপণ্য, ইলেকট্রনিকস সামগ্রীসহ উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন বিভিন্ন পণ্য।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, বাজারদর ও চাহিদা অনুযায়ী সিন্ডিকেট নিয়মিত রুট ও পণ্যের তালিকা বদলে নেয়। চোরাচালান মানেই কয়েকজন দরিদ্র বাহক- এমন ধারণা এখন বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পুরো চক্রটি কয়েকটি স্তরে পরিচালিত হয়। প্রথম স্তরে স্থানীয় সংগ্রাহক, দ্বিতীয় স্তরে ক্যারিয়ার, তৃতীয় স্তরে সীমান্ত সমন্বয়কারী, চতুর্থ স্তরে অর্থদাতা এবং সর্বশেষ স্তরে থাকে মূল হোতা বা গডফাদার।
তাদের অনেকেই সীমান্ত এলাকায় বসবাসও করেন না। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, রাজনৈতিক বলয় ও দুর্নীতিগ্রস্ত কিছু ব্যক্তির সহযোগিতায় এসব চক্র টিকে থাকে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সীমান্তবর্তী গ্রামের অনেক মানুষের আয়ের উৎস সীমিত। চা-বাগানের শ্রমিক, দিনমজুর কিংবা বেকার তরুণদের একটি অংশ দ্রুত আয়ের আশায় চোরাচালানের ক্যারিয়ার হিসেবে যুক্ত হচ্ছে।
এক রাতেই কয়েক হাজার টাকা আয় হওয়ার প্রলোভনে অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত এপার-ওপার করছে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের সংকট ও সীমান্ত অঞ্চলের দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামোই টিকিয়ে রেখেছে চোরাচালানকে। সূত্রমতে, একসময় বাঁশির শব্দে দেওয়া হতো সংকেত। এখন সেই জায়গা নিয়েছে স্মার্টফোন। লোকেশন শেয়ারিং, এনক্রিপ্টেড মেসেজ, ভিডিও কল, এমনকি ড্রোন ব্যবহার করে নজরদারির অভিযোগও উঠেছে বিভিন্ন সময়ে।
ফলে অভিযান পরিচালনা আগের তুলনায় আরও জটিল হয়ে পড়েছে। বছরজুড়ে বিজিবি বিপুল পরিমাণ মাদক, গরু, কসমেটিকস ও বিভিন্ন চোরাইপণ্য জব্দ করলেও প্রশ্ন থেকেই যায়, এত অভিযানের পরও সিন্ডিকেট টিকে থাকে কীভাবে? নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু ক্যারিয়ার গ্রেপ্তার করলেই হবে না। অর্থের উৎস, মূল পরিকল্পনাকারী, আর্থিক লেনদেন এবং সীমান্তের প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক ভাঙতে না পারলে চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আনা অসম্ভব।
তাদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান জোরদার করা, সীমান্তে সেন্সর, ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো, অর্থপাচারের উৎস অনুসন্ধান, সীমান্তবর্তী এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংঘবদ্ধ সীমান্ত অপরাধকে জাতীয় নিরাপত্তার অগ্রাধিকার ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করারও তাগিদ দিয়েছেন তারা।
দীর্ঘদিন ধরে মৌলভীবাজার সীমান্তে সড়ক ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দা এবং সীমান্তসংশ্লিষ্টরা। প্রশ্ন উঠছে, এত বছরেও কেন ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি? সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অবকাঠামোগত দুর্বলতা যতদিন থাকবে, ততদিন সীমান্তের অন্ধকার পথ চোরাকারবারিদের নিরাপদ করিডোর হয়েই থাকবে।



















