বাসে উঠেই প্রথম প্রশ্ন, ভাড়া কত? আগে যে ভাড়া ছিল, এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে কয়েক টাকা। শহরের অভ্যন্তরে কোথাও ৫ টাকা, কোথাও ১০ টাকা। দূরপাল্লায় আরও বেশি। যাত্রী জানতে চাইছেন, কেন? উত্তর আসছে, তেলের দাম বেড়েছে।
কেউ বলছেন, নতুন ভাড়া হয়েছে। কেউ আবার বলছেন, গাড়ির খরচ বেড়েছে। কিন্তু সরকারি তথ্য অনুসারে হিসাবটি এত বড় নয়। সরকার কিলোমিটারে ভাড়া বাড়িয়েছে মাত্র ১৭ পয়সা। এই ১৭ পয়সাই এখন সড়কে ‘যেমন খুশি তেমন নাও’ আইনে পরিণত হয়েছে। ফলে কোথাও বেশি টাকা দিতে আপত্তি জানাতে গিয়ে নাজেহাল হচ্ছেন যাত্রীরা। অনেক জায়গায় হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে।
কোথাও যাত্রীকে ধাক্কা দিয়ে বা জোর করে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে— এমন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। শুধু বাস বা লঞ্চ ভাড়াই নয়, এই বৃদ্ধির কারণে একই অজুহাতে অসৎ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট পণ্য পরিবহন ব্যয়ের দোহাই দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর খেসারত দিতে হচ্ছে বা হবে সাধারণ জনগণকে। তবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সম্ভাব্য যে অভিঘাত তৈরি হতে পারে, তা কীভাবে কমানো যায়, সে জন্য তারা কাজ করছেন।
মূল্য স্থিতিশীল থাকবে এবং মূল্যের ওপর তেমন লক্ষণীয় কোনো অভিঘাত আসবে না বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি। অপরদিকে নতুন বাসভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে, তবে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায় করলে সংশ্লিষ্ট বাসের রুট পারমিট বাতিল করা হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, সরকার এর আগে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে।
এখন তেলের দাম বাড়াল। এরপর হয়তো গ্যাসের দামও বাড়াবে। মানুষের টিকে থাকা চরম কঠিন হবে। ১৪ লাখ মানুষের (সরকারি কর্মচারী) বেতন বাড়ল। বাকিদের বেশির ভাগের অবস্থা করুণ। মানুষের যদি কেনার সামর্থ্য না থাকে, শুল্ক-কর কোথা থেকে আসবে? তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার যতটুকু ভর্তুকি কমাবে, তার চেয়ে বেশি রাজস্ব হারাবে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে।
এদিকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা চাওয়ায় বাস কাউন্টার ও সড়কে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে নিয়মিত বিরোধ ও অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে। আবার অনেক স্থানে অতিরিক্ত ভাড়ার নৈরাজ্য ও জ্বালানি ব্যয়ের অজুহাতে বাস চলাচল কমিয়ে দিয়েছেন মালিকেরা, ফলে সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। ঢাকার মিরপুর থেকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার রুটের যাত্রী রাশেদুল ইসলামের অভিযোগ, তার নিয়মিত ভাড়া ছিল ৪০ টাকা।
এখন ৫০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে কন্ডাক্টরের উত্তর— ‘পোষাইলে উঠেন, নাইলে নাইমা যান। ’ ঢাকা-পাবনা রুটেও একই অভিযোগ। গাবতলী থেকে পাবনায় যাওয়ার টিকিটের দাম এখন নিচ্ছে এসি ৮০০, নন-এসি ৭০০ টাকা। অথচ এক দিন আগেও এটা ছিল ৭০০ ও ৬০০ টাকা। রূপালী বাংলাদেশকে এ তথ্য জানান গাবতলী থেকে যাত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান।
তার প্রশ্ন, কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়লে এত বেশি টাকা বাড়ে কীভাবে? নুসরাত জাহান ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ভাড়া বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পরিবহন ব্যয়ের সম্পর্কও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সরকার যে ভাড়া নির্ধারণ করেছে, তার বাইরে পরিবহন মালিক বা শ্রমিকের ইচ্ছামতো ভাড়া আদায়ের সুযোগ আছে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন।
শুধু তাই নয়, যাত্রীরা মাত্রাতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে পরিবহন শ্রমিকেরা যে ব্যবহার করেন, সেটাও মেনে নেওয়া কঠিন ও কষ্টকর। ঢাকা বগুড়া রুটের আরেক যাত্রী আবু কাওসার খান এই প্রতিবেদককে বলেন, প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সার বাড়তি হিসাব সামান্য হলেও বাস্তবে ‘রাউন্ড ফিগার’ করার নামে অনেক টাকা বাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আগের চাইতে এখন ভাড়া ১০০ টাকা বেশি নিচ্ছে। অনেক যাত্রী বুঝতেই পারছেন না, তিনি সরকারি ভাড়া দিচ্ছেন, নাকি পরিবহন মালিক-শ্রমিকের খেয়ালখুশি মতো বাড়ানো ভাড়া। তার মতে, এই মুহূর্তে টারমিনাল বা বাসস্ট্যান্ডে ভাড়ার তালিকার স্বচ্ছতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নইলে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে থাকবে। আবু কাওসার খান আরও বলেন, একজন যাত্রী যদি বাসে ওঠার পর জানতে না পারেন তার গন্তব্যের নির্ধারিত ভাড়া কত, তাহলে অতিরিক্ত আদায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার ভিত্তিটিও দুর্বল হয়ে যায়।
শুধু প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ঘোষণা করলেই হবে না। প্রতিটি রুটের জন্য শুরু ও শেষ গন্তব্য অনুযায়ী নির্ধারিত ভাড়া বাসের ভেতরেও দৃশ্যমানভাবে টাঙানো দরকার। সঙ্গে এমন একটি ফোন নম্বর থাকা দরকার, যাতে কোথাও বেশি ভাড়া দাবি করলে তাৎক্ষণিক টেলিফোন করে যাত্রী তার অভিযোগ জানাতে পারেন। পাশাপাশি কাউন্টার ভাড়া, অনলাইন ভাড়া, বাসের ভেতরে আদায় করা ভাড়া— সব জায়গায় একই হিসাব আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
কোথাও ওয়েবিল, কোথাও সিটের সংখ্যা, কোথাও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি দেখিয়ে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ভাড়া বৃদ্ধি প্রসঙ্গে শাহজাদপুর ট্রাভেলসের গাবতলীর কাউন্টার ম্যানেজার শাহাদত জানান, সোমবার ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জের ভাড়া ছিল ৫০০ টাকা। মঙ্গলবার থেকে সেই ভাড়া করা হয়েছে ৬০০ টাকা। যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক নেতা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ভাড়া নিয়ন্ত্রণে মহানগরগুলোতে মাঝেমধ্যেই বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, অভিযান কতটা স্থায়ী ফল দিচ্ছে? অভিযোগ রয়েছে, কোনো এলাকায় অভিযান শুরু হলে খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বাস শ্রমিকদের মধ্যে খবর পৌঁছে যায়। কিছু সময়ের জন্য পরিস্থিতি বদলে যায়। অভিযান শেষ হলে আবার আগের চিত্র ফিরে আসে। তিনি আরও বলেন, এই সমস্যা আসলে মোবাইল কোর্টের সংখ্যা দিয়ে সমাধান করা কঠিন। একজন ম্যাজিস্ট্রেট একটি বাস থামিয়ে জরিমানা করতে পারেন।
কিন্তু একই সময়ে শহরের শত শত বাসে কত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, তা তিনি দেখবেন কীভাবে? প্রযুক্তিই এখানে বড় সমাধান হতে পারে। প্রতিটি রুটের নির্ধারিত ভাড়া ডিজিটালভাবে প্রকাশ করা দরকার। প্রতিটি বাসে কিউআর কোড রাখা উচিত। যাত্রী মোবাইল ফোনে গন্তব্য নির্বাচন করলেই নির্ধারিত ভাড়া দেখতে পারবেন। ই-টিকিট চালু হলে আদায়কৃত অর্থের রেকর্ড থাকবে।
অভিযোগ করলে সংশ্লিষ্ট বাস ও কর্মীর তথ্য বের করা সম্ভব হবে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সম্প্রতি তেলের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে টায়ার, মবিলসহ বাসের যন্ত্রাংশের দাম বেড়েছে। অনেক বাসে যাত্রী আসন কমিয়ে আরামদায়ক পরিবহন চালানোর কারণে পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, মালিক বা সংশ্লিষ্ট কর্চারীরা যা ইচ্ছে ভাড়া নেবেন।
সরকার প্রতি কিলোমিটারে যে ভাড়া নির্ধারণ করেছে, সেটাই নিতে হবে। এর বেশি নেওয়া অপরাধ হবে। নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে কোনো চালক বা হেলপার অতিরিক্ত টাকা নিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাইফুল আলম আরও বলেন, এ ধরনের অভিযোগ মৌখিকভাবে অনেকে তাদের কাছেও করেছেন। গতকাল এ বিষয় নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করা হয়েছে। বিআরটিএকেও বিষয়টি দেখভাল করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
কারো বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে এবং সেটার সত্যতা মিললে মালিক সমিতির পক্ষ থেকেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। বেসরকারি সংস্থা হেলফ ফর ইউর প্রধান নির্বাহী রুনা আক্তার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে পরিবহনসংশ্লিষ্টরা তাদের ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়ায়। এর কারণে শুধু লঞ্চ বা বাসযাত্রী নন, প্রত্যেক জনগণকেই খেসারত দিতে হচ্ছে।
কাঁচামাল বা পণ্য পরিবহন ব্যয়ও এর ফলে বেড়ে যাচ্ছে। ফলে ভাড়া নির্ধারণের পর সরকার শুধু প্রজ্ঞাপন জারি করেই দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। কার্যকর ভাড়া কত, কোন রুটে কত, অতিরিক্ত আদায়ের অভিযোগ কতটি, কত বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। রুনা আক্তার আরও বলেন, যাত্রী যেন বাসে ওঠার আগেই নিজের গন্তব্যের নির্ধারিত ভাড়া জানতে পারেন।
বাসের দরজায় ভাড়ার তালিকা থাকতে হবে। কাউন্টারে তালিকা থাকতে হবে। অনলাইনে তালিকা থাকতে হবে। টিকিটে ভাড়া উল্লেখ থাকতে হবে। অভিযোগের জন্য কার্যকর নম্বর থাকতে হবে। অভিযোগের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো, তারও রেকর্ড থাকতে হবে। শুধু কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বললে হবে না। যাত্রীকে দেখাতে হবে, কতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সেই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়েছে।


















