তিনি কথা বলতে পারেন না, মনের ভাব প্রকাশ করতে হয় ইশারায়। বয়সের ভারে শরীর আগের মতো সায় না দিলেও থেমে নেই তাঁর জীবনসংগ্রাম। প্রতিদিন হাতে কিছু বই নিয়ে তিনি হাটে যান এবং ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন শিশুদের পড়ার বই ‘আদর্শলিপি’।
বই বিক্রি করে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই চলে তাঁর জীবন। তিনি আব্দুস ছাত্তার। বয়স ৬২ বছর। নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর সদরের চাঁচকৈড় হাটে ফেরি করে আদর্শলিপি বিক্রি করেন। তিনি পৌর সদরের মরহুম ছইরুদ্দিনের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে বই বিক্রিই তাঁর জীবিকার প্রধান অবলম্বন। তাঁর বাবা ছইরুদ্দিনও বই বিক্রি করতেন। বাবার দেখানো পথেই পেশাটি বেছে নিয়েছেন আব্দুস ছাত্তার।
কথা বলতে না পারলেও ইশারা-ইঙ্গিতে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বই বিক্রি করেন তিনি। তবে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কঠিন হয়ে উঠেছে তাঁর জীবন। বই বিক্রি করে প্রতিদিন যে অল্প কিছু আয় হয়, তা দিয়ে বর্তমান সময়ে জীবন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তারপরও জীবিকার তাগিদে নিয়মিত হাটে আসেন তিনি। সময়ের সঙ্গে জীবিকা ও মানুষের জীবনযাপনের ধরন বদলালেও তাঁর জীবন যেন আটকে আছে সেই পুরোনো বইয়ের ফেরিতে।
আব্দুস ছাত্তারের সংসারও টেকেনি। একসময় তাঁর স্ত্রী ছিলেন। কিন্তু সেই সংসার বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। এখন একাই জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। নিজের কষ্টের কথা মুখে প্রকাশ করতে পারেন না। ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করেন বুকের ভেতরে জমে থাকা হাহাকার। চাঁচকৈড় হাটের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বই বিক্রি করতে দেখা যায় তাঁকে। কারও কাছে বই বিক্রি হলে মুখে ফুটে ওঠে হাসি।
আবার দীর্ঘ সময় কোনো বই বিক্রি না হলে নীরবে অপেক্ষা করেন। তাঁর কাছে একটি বই বিক্রি মানেই শুধু কয়েক টাকা আয় নয়, বরং দিনের জীবিকা নির্বাহের আরেকটি সুযোগ। বয়স হয়েছে ৬২। জীবনের দীর্ঘ সময় পার করেছেন বই হাতে নিয়ে। এখন শরীর আর আগের মতো শক্তি দেয় না। আয়ও খুব বেশি নয়। তবু অন্যের কাছে হাত না পেতে নিজের শ্রমেই বেঁচে থাকতে চান আব্দুস ছাত্তার।
কথা বলতে না পারলেও তাঁর নীরব পথচলা যেন অনেক কথাই বলে। হাতে কয়েকটি বই, চোখে জীবনের নানা অভিজ্ঞতা আর বুকের ভেতর জমে থাকা অজস্র না-বলা কথা নিয়ে প্রতিদিন তিনি হাজির হন চাঁচকৈড় হাটে। জীবন থেমে থাকেনি, তাই থামেনি তাঁর বই বিক্রির পথচলাও।



















