আজ মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৩১ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ০২ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩৩°C
সর্বোচ্চ: ৩৫°C
সর্বনিম্ন: ২৮°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৬০%

পাহাড়ে শান্তির স্থায়ী নকশা চান প্রধানমন্ত্রী: স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম

  • MIT ERP
  • Update Time : 04:33:22 pm, Tuesday, 15 September 2026
  • 10

পাহাড়ে শান্তির স্থায়ী নকশা চান প্রধানমন্ত্রী: স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের মানচিত্রের এক অখণ্ড নৈসর্গিক ভূখণ্ড, এটি আমাদের জাতীয় ভূ-রাজনীতি, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং কৌশলগত সুরক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাণকেন্দ্র। সুবিশাল পর্বতমালা, ঘন সবুজ অরণ্য, খরা ও সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলা পাহাড়ি নদী, সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক সীমান্ত এবং বহু জাতিগত বৈচিত্র্যে ভরা এই অঞ্চলটি একাধারে দেশের অপার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার আধার এবং দীর্ঘকালের এক জটিল ঐতিহাসিক সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দু।

এখানে যেমন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবি রাখে, তেমনি সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার, সুষম অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এবং আন্তঃসম্প্রদায়িক গভীর পারস্পরিক আস্থা।

একটি প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যখন কোনো দীর্ঘস্থায়ী সংবেদনশীল অঞ্চলের সংকট নিরসনে কেবল সাময়িক প্রতিকার বা প্রথাগত প্রশাসনিক পদক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সুদূরপ্রসারী ও প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান খোঁজে, তখন তা টেকসই শান্তির স্থায়ী ভিত্তি নির্মাণ করে। অতি সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি, নির্বাহী কমিটি ও পরামর্শক কমিটি—এই তিন স্তরের সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠন করেছে সরকার।

এই দূরদর্শী পদক্ষেপকে কেবল কোনো রুটিন প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস বা প্রথাগত কমিটি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বস্তুত পার্বত্য অঞ্চলকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সরকারের একটি মৌলিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের বার্তা তুলে ধরে। প্রধানমন্ত্রী পাহাড়ের দীর্ঘদিনের ক্ষণস্থায়ী শান্তির বদলে একটি চিরস্থায়ী, সুদৃঢ় এবং জনগণমুখী শান্তির নকশা বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ, আর সরকারের এই নতুন ত্রিস্তরীয় উদ্যোগ সেই দর্শনেরই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বহুমাত্রিক সংকটে আমরা অতীতে বারবার একমুখী দৃষ্টিভঙ্গির ভুল করেছি। কখনো এটিকে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারির চোখে দেখা হয়েছে, কখনো এটিকে কেবল ভূমি বিরোধ ও স্থানীয় রাজনৈতিক লড়াই হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে, আবার কখনো বা স্রেফ কিছু রাস্তাঘাট নির্মাণ বা অবকাঠামোগত অনুদানের চশমায় মূল্যায়ন করার চেষ্টা করা হয়েছে।

অথচ বাস্তব সত্য হলো, এই প্রতিটি সংকট বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং তারা একে অপরের সঙ্গে অত্যন্ত গভীরভাবে জড়িয়ে থেকে একটি বিষাক্ত চক্র তৈরি করে রেখেছে। পাহাড়ের ভূমির মালিকানা ও সীমানা সংক্রান্ত সুদীর্ঘ বিরোধগুলো যখন বছরের পর বছর সুরাহা ছাড়া ঝুলে থাকে, তখন তা স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক ধরনের সামাজিক অবিশ্বাস তৈরি করে।

এই মনস্তাত্ত্বিক অবিশ্বাস রাজনৈতিক আঙিনায় উত্তাপ জোগায়, আর সেই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে জন্ম নেয় অবৈধ সশস্ত্র সংগঠন ও আঞ্চলিক কোন্দল। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে নিরাপত্তাহীনতার কালো ছায়া নেমে আসে, যার সরাসরি আঘাত পড়ে আঞ্চলিক ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও পর্যটন শিল্পের ওপর। অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা রুদ্ধ হয়ে পড়লে স্থানীয় সম্ভাবনাময় তরুণেরা ক্রমান্বয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হয়, যা পরবর্তীতে তাঁদের ঠেলে দেয় অপরাধমূলক পথ কিংবা সশস্ত্র চক্রের দিকে।

এই পুরো প্রক্রিয়াটির দিকে তাকালে বোঝা যায়, পাহাড়ে একটি জটিলতা কীভাবে আরেকটি গভীরতর সংকটকে জন্ম দিয়ে চলেছে। এই মারাত্মক দুষ্টচক্র থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বের করে আনতে হলে প্রয়োজন ছিল এমন এক সমন্বিত উদ্যোগের, যা নীতি প্রণয়ন থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে একটি সুনির্দিষ্ট সূত্রে গেঁথে দেবে। সরকারের গঠিত নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আসল শক্তি ঠিক এই জায়গায়।

এই ত্রিস্তরী কাঠামোর সর্বোচ্চ স্তরে থাকা জাতীয় কমিটি পুরো প্রক্রিয়াকে কৌশলগত দিকনির্দেশনা ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় দেবে, নির্বাহী কমিটি সেই নীতিগুলোকে বাস্তবায়নযোগ্য নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনায় রূপান্তরিত করবে, আর তৃণমূল পর্যায় থেকে পরামর্শক কমিটি সরাসরি মাঠের অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় মানুষের নাড়ির খবর পৌঁছে দেবে নীতিনির্ধারকদের কাছে।

এটি নিশ্চিতভাবেই প্রশাসনিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার এক বিরল দৃষ্টান্ত, যা জাতীয় নীতিনির্ধারণের সঙ্গে প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদের এক সরাসরি সেতু তৈরি করল। রাষ্ট্রের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব অবশ্যই তার সীমান্ত সুরক্ষিত রাখা, সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা এবং প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পার্বত্য চট্টগ্রামে যুগ যুগ ধরে চলে আসা সশস্ত্র অপরাধ, আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যকার রক্তাক্ত সংঘাত, চাঁদাবাজি, মানবপাচার ও অপহরণের মতো সহিংস কর্মকাণ্ড মূলত সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারাকে জিম্মি করে রেখেছে।

সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে, জিম্মি করে কোনো রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত দাবি আদায়ের প্রথা কোনো গণতান্ত্রিক ও মুক্ত সমাজে মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু এর পাশাপাশি আমাদের এটিও গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে যে, বন্দুকের নল বা কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি দিয়ে কখনো স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। শান্তি টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় কেবল তখনই, যখন রাষ্ট্র তার নাগরিকের মনে নিরাপত্তাবোধের পাশাপাশি পরম আস্থার জন্ম দিতে সক্ষম হয়।

সাধারণ মানুষ যখন অনুধাবন করতে পারে যে রাষ্ট্র কেবল শাসনের লাঠি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে নেই, বরং তাদের অধিকার, ঐতিহ্য, স্বকীয়তা ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষার অভিভাবক হিসেবে পাশে রয়েছে—তখন তারা নিজেরাই রাষ্ট্রের সুরক্ষাকবচে পরিণত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের পুরো সংকট কাঠামোর সবচেয়ে সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর দিকটি হলো ভূমি বিরোধ। পাহাড়ের প্রতিটি মানুষের কাছে জমি কেবল স্থাবর সম্পত্তি বা অর্থ মাপার মাপকাঠি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের জাতিগত পরিচয়, অস্তিত্বের লড়াই, জীবনজীবিকা এবং পূর্বপুরুষের স্মৃতি।

ফলে ভূমির মতো এত স্পর্শকাতর বিষয়টি একপক্ষীয় বা জোরপূর্বক কোনো সিদ্ধান্ত দিয়ে স্থায়ীভাবে মীমাংসা করা অসম্ভব। এর একমাত্র পথ হলো নিরপেক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়া, প্রামাণ্য দলিলের স্বচ্ছ সত্যতা যাচাই এবং স্থানীয় বাস্তবতার মানবিক মূল্যায়ন। সরকারের গঠিত নতুন পরামর্শক কমিটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, আঞ্চলিক পরিষদ এবং তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রতিনিধিত্বকে যুক্ত করার সিদ্ধান্তটি এক অসাধারণ গণতান্ত্রিক উদ্যোগ।

এর ফলে ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় আদিবাসী ও বাঙালি প্রতিনিধিদের মতামত আনুষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব পাওয়ার পথ প্রশস্ত হলো। তবে নিশ্চিত করতে হবে যে, ভূমি বিরোধ মীমাংসার পুরো প্রক্রিয়াটি যেন কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব কিংবা প্রভাবশালী কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহলের চাপ থেকে শতভাগ মুক্ত থাকে। বিচার ও সমাধানের একমাত্র মাপকাঠি হতে হবে আইন, ঐতিহাসিক দলিল, ন্যায়বিচার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।

উন্নয়ন প্রসঙ্গে আমাদের রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিকেও নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার সময় এসেছে। পাহাড়ে হাজার কোটি টাকা খরচ করে সুপ্রশস্ত সড়ক, সুউচ্চ সেতু কিংবা ঝকঝকে সরকারি ভবন নির্মাণ নিশ্চিতভাবেই দৃশ্যমান যোগাযোগের মাইলফলক। কিন্তু এই কাঠামোগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যদি স্থানীয় সাধারণ মানুষের ভেতরের জীবনযাত্রার মান না বদলায়, যদি তাদের মৌলিক জীবনমানে পরিবর্তন না আসে—তবে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

পাহাড়ের প্রতিটি জনপদে আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষার বিস্তার, গুণগত স্বাস্থ্যসেবা, সুপেয় পানির বন্দোবস্ত, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, আধুনিক কৃষিব্যবস্থা এবং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির সুনির্দিষ্ট সুযোগ। পাহাড়ের তরুণ প্রজন্ম যদি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূলধারায় যুক্ত হতে না পারে, যদি আধুনিক প্রযুক্তির আলো ও সম্মানজনক আয়ের পথ তাদের কাছ থেকে দূরে থাকে, তবে তারা সহজেই উগ্রবাদ কিংবা সশস্ত্র চক্রের লোভনীয় ফাঁদে পা দেবে।

ফলে নিরাপত্তার নীতিকে কেবল অস্ত্রের ভাষায় না দেখে, তাকে স্থানীয় অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির কৌশলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। নিরাপত্তা ও উন্নয়ন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একটি ছাড়া অন্যটি সম্পূর্ণ অর্থহীন। কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলটি বাংলাদেশের সার্বভৌম সুরক্ষার জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ফ্রন্ট।

দুটি প্রতিবেশী দেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় দুর্গম ভৌগোলিক সুযোগ কাজে লাগিয়ে অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান, মাদক ব্যবসা ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধমূলক কার্যক্রম প্রায়শই এই অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে। এই স্পর্শকাতর সীমান্ত সুরক্ষায় প্রযুক্তি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আধুনিক নজরদারি যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি সীমান্তের আদিবাসী ও বাঙালি জনগণকে এই সুরক্ষাব্যবস্থার প্রধান অংশীদার বানাতে হবে।

কারণ, সীমান্তের বাসিন্দাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করে ও তাঁদের সুনির্দিষ্ট সহযোগিতায় নিয়ে পরিচালিত সীমান্ত সুরক্ষাই হয় সবচেয়ে শক্তিশালী ও নিশ্ছিদ্র। বহুজাতিভিত্তিক, বহুভাষিক ও বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক সহাবস্থান পার্বত্য অঞ্চলকে যে রূপ দিয়েছে, তা বাংলাদেশের রূপ রূপায়নে এক অপার সৌন্দর্য। পাহাড়ে বসবাসকারী বৈচিত্র্যময় পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীসমূহ এবং স্থানীয় বাঙালিদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

একটি প্রগতিশীল রাষ্ট্রের মহান দায়িত্ব হলো—যেকোনো নাগরিক যেন তার ভাষা, ধর্মীয় বিশ্বাস বা নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়ের জন্য বিন্দুমাত্র বৈষম্য বা নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে। সম্প্রীতি কোনো ফাঁপা সরকারি ভাষণ বা সাময়িক রাজনৈতিক সমাবেশের বিষয় নয়; মাঠপর্যায়ে নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ, সুষম অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর সমতার মাধ্যমেই এই সামাজিক সম্প্রীতির বাস্তবায়ন সম্ভব।

সরকার গঠিত এই কাঠামোর মাধ্যমে খসড়া কর্মকৌশল প্রণয়নের জন্য তিন মাসের যে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তা আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ভাঙার এক ইতিবাচক সংকেত। তবে কেবল সময়ের গতি বজায় রাখলেই চলবে না, সেই কর্মকৌশলের গুণগত মান নিশ্চিত করাটাও সমান জরুরি। এই খসড়া যেন অতীতে তৈরি হওয়া অজস্র সরকারি প্রতিবেদন বা লাল ফিতার বন্দি ভাষার প্রথাগত পুনরাবৃত্তি না হয়।

এতে থাকতে হবে সুনির্দিষ্ট বাজেট, স্পষ্ট বাস্তবায়ন সূচক, সময়সীমা এবং ব্যর্থতার দায় নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা। কারণ বাংলাদেশের মানুষ এখন আর টেবিলের ওপর স্তূপীকৃত প্রতিবেদন দেখতে চায় না; তারা দেখতে চায় মাঠপর্যায়ের দৃশ্যমান গুণগত পরিবর্তন। পাহাড়ে চিরস্থায়ী স্থিতিশীলতা ফেরাতে হলে রাষ্ট্রকে এখন একটি নতুন ও আধুনিক ভারসাম্যপূর্ণ দর্শনে হাঁটতে হবে।

একদিকে জাতীয় প্রতিরক্ষা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র থাকবে কঠোর ও আপসহীন; অন্যদিকে স্থানীয় জনগণের মৌলিক অধিকার, সামাজিক স্বকীয়তা, সংস্কৃতি, ভূমি ও উন্নয়নের অধিকার নিশ্চিতের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র হবে চূড়ান্তভাবে সংবেদনশীল ও উদার। এই দুই নীতির মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই, বরং এটিই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের আসল শক্তি।

সরকারের ১০ সেপ্টেম্বরের এই বৈপ্লবিক কাঠামো কেবল একটি প্রশাসনিক আদেশ নয়, এটি পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চিন্তাভাবনায় এক নতুন ভোরের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পাহাড়ে চিরস্থায়ী শান্তি কেবল অস্ত্রের শক্তি থেকে আসবে না, আবার স্রেফ অবকাঠামোগত প্রকল্পের মাধ্যমেও কেনা যাবে না। প্রকৃত ও টেকসই শান্তি তখনই সম্ভব, যখন নিরাপত্তার সাথে যুক্ত হবে ন্যায়বিচার, উন্নয়নের সাথে যুক্ত হবে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সাথে মিশে যাবে সাধারণ নাগরিকের ভালোবাসা ও গভীর বিশ্বাস।

পরিশেষে বলতে চাই,পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের কোনো সমস্যা বা বোঝা নয়; এটি আমাদের এক অপূর্ব প্রাকৃতিক রত্ন ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। পাহাড়ের প্রতিটি মানুষ এ দেশেরই সম্মানিত নাগরিক এবং তাঁদের ভাগ্য বাংলাদেশের ভাগ্যের সঙ্গে সুদৃঢ়ভাবে বাঁধা। নতুন গঠিত এই তিন স্তরের কাঠামো যদি তার রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে গতিশীল প্রশাসনিক দক্ষতায় রূপান্তর করতে পারে এবং সেই সিদ্ধান্তগুলোকে সাধারণ মানুষের কল্যাণে ছড়িয়ে দিতে পারে, তবে ইতিহাস বদলে যাবে।

সুতরাং আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের রক্তক্ষরণ ও অস্থিরতার অন্ধকার অধ্যায় অতীত হয়ে সেখানে উদিত হবে সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা, বৈচিত্র্যময় প্রীতি ও চিরস্থায়ী শান্তির এক নতুন সূর্য। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন। লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

চট্টগ্রামে অনলাইন প্রতারণা: গ্রেপ্তার ৬৩ বিদেশির দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর

পাহাড়ে শান্তির স্থায়ী নকশা চান প্রধানমন্ত্রী: স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম

Update Time : 04:33:22 pm, Tuesday, 15 September 2026

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের মানচিত্রের এক অখণ্ড নৈসর্গিক ভূখণ্ড, এটি আমাদের জাতীয় ভূ-রাজনীতি, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং কৌশলগত সুরক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাণকেন্দ্র। সুবিশাল পর্বতমালা, ঘন সবুজ অরণ্য, খরা ও সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলা পাহাড়ি নদী, সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক সীমান্ত এবং বহু জাতিগত বৈচিত্র্যে ভরা এই অঞ্চলটি একাধারে দেশের অপার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার আধার এবং দীর্ঘকালের এক জটিল ঐতিহাসিক সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দু।

এখানে যেমন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবি রাখে, তেমনি সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার, সুষম অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এবং আন্তঃসম্প্রদায়িক গভীর পারস্পরিক আস্থা।

একটি প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যখন কোনো দীর্ঘস্থায়ী সংবেদনশীল অঞ্চলের সংকট নিরসনে কেবল সাময়িক প্রতিকার বা প্রথাগত প্রশাসনিক পদক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সুদূরপ্রসারী ও প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান খোঁজে, তখন তা টেকসই শান্তির স্থায়ী ভিত্তি নির্মাণ করে। অতি সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি, নির্বাহী কমিটি ও পরামর্শক কমিটি—এই তিন স্তরের সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠন করেছে সরকার।

এই দূরদর্শী পদক্ষেপকে কেবল কোনো রুটিন প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস বা প্রথাগত কমিটি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বস্তুত পার্বত্য অঞ্চলকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সরকারের একটি মৌলিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের বার্তা তুলে ধরে। প্রধানমন্ত্রী পাহাড়ের দীর্ঘদিনের ক্ষণস্থায়ী শান্তির বদলে একটি চিরস্থায়ী, সুদৃঢ় এবং জনগণমুখী শান্তির নকশা বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ, আর সরকারের এই নতুন ত্রিস্তরীয় উদ্যোগ সেই দর্শনেরই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বহুমাত্রিক সংকটে আমরা অতীতে বারবার একমুখী দৃষ্টিভঙ্গির ভুল করেছি। কখনো এটিকে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারির চোখে দেখা হয়েছে, কখনো এটিকে কেবল ভূমি বিরোধ ও স্থানীয় রাজনৈতিক লড়াই হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে, আবার কখনো বা স্রেফ কিছু রাস্তাঘাট নির্মাণ বা অবকাঠামোগত অনুদানের চশমায় মূল্যায়ন করার চেষ্টা করা হয়েছে।

অথচ বাস্তব সত্য হলো, এই প্রতিটি সংকট বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং তারা একে অপরের সঙ্গে অত্যন্ত গভীরভাবে জড়িয়ে থেকে একটি বিষাক্ত চক্র তৈরি করে রেখেছে। পাহাড়ের ভূমির মালিকানা ও সীমানা সংক্রান্ত সুদীর্ঘ বিরোধগুলো যখন বছরের পর বছর সুরাহা ছাড়া ঝুলে থাকে, তখন তা স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক ধরনের সামাজিক অবিশ্বাস তৈরি করে।

এই মনস্তাত্ত্বিক অবিশ্বাস রাজনৈতিক আঙিনায় উত্তাপ জোগায়, আর সেই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে জন্ম নেয় অবৈধ সশস্ত্র সংগঠন ও আঞ্চলিক কোন্দল। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে নিরাপত্তাহীনতার কালো ছায়া নেমে আসে, যার সরাসরি আঘাত পড়ে আঞ্চলিক ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও পর্যটন শিল্পের ওপর। অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা রুদ্ধ হয়ে পড়লে স্থানীয় সম্ভাবনাময় তরুণেরা ক্রমান্বয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হয়, যা পরবর্তীতে তাঁদের ঠেলে দেয় অপরাধমূলক পথ কিংবা সশস্ত্র চক্রের দিকে।

এই পুরো প্রক্রিয়াটির দিকে তাকালে বোঝা যায়, পাহাড়ে একটি জটিলতা কীভাবে আরেকটি গভীরতর সংকটকে জন্ম দিয়ে চলেছে। এই মারাত্মক দুষ্টচক্র থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বের করে আনতে হলে প্রয়োজন ছিল এমন এক সমন্বিত উদ্যোগের, যা নীতি প্রণয়ন থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে একটি সুনির্দিষ্ট সূত্রে গেঁথে দেবে। সরকারের গঠিত নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আসল শক্তি ঠিক এই জায়গায়।

এই ত্রিস্তরী কাঠামোর সর্বোচ্চ স্তরে থাকা জাতীয় কমিটি পুরো প্রক্রিয়াকে কৌশলগত দিকনির্দেশনা ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় দেবে, নির্বাহী কমিটি সেই নীতিগুলোকে বাস্তবায়নযোগ্য নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনায় রূপান্তরিত করবে, আর তৃণমূল পর্যায় থেকে পরামর্শক কমিটি সরাসরি মাঠের অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় মানুষের নাড়ির খবর পৌঁছে দেবে নীতিনির্ধারকদের কাছে।

এটি নিশ্চিতভাবেই প্রশাসনিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার এক বিরল দৃষ্টান্ত, যা জাতীয় নীতিনির্ধারণের সঙ্গে প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদের এক সরাসরি সেতু তৈরি করল। রাষ্ট্রের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব অবশ্যই তার সীমান্ত সুরক্ষিত রাখা, সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা এবং প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পার্বত্য চট্টগ্রামে যুগ যুগ ধরে চলে আসা সশস্ত্র অপরাধ, আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যকার রক্তাক্ত সংঘাত, চাঁদাবাজি, মানবপাচার ও অপহরণের মতো সহিংস কর্মকাণ্ড মূলত সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারাকে জিম্মি করে রেখেছে।

সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে, জিম্মি করে কোনো রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত দাবি আদায়ের প্রথা কোনো গণতান্ত্রিক ও মুক্ত সমাজে মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু এর পাশাপাশি আমাদের এটিও গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে যে, বন্দুকের নল বা কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি দিয়ে কখনো স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। শান্তি টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় কেবল তখনই, যখন রাষ্ট্র তার নাগরিকের মনে নিরাপত্তাবোধের পাশাপাশি পরম আস্থার জন্ম দিতে সক্ষম হয়।

সাধারণ মানুষ যখন অনুধাবন করতে পারে যে রাষ্ট্র কেবল শাসনের লাঠি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে নেই, বরং তাদের অধিকার, ঐতিহ্য, স্বকীয়তা ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষার অভিভাবক হিসেবে পাশে রয়েছে—তখন তারা নিজেরাই রাষ্ট্রের সুরক্ষাকবচে পরিণত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের পুরো সংকট কাঠামোর সবচেয়ে সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর দিকটি হলো ভূমি বিরোধ। পাহাড়ের প্রতিটি মানুষের কাছে জমি কেবল স্থাবর সম্পত্তি বা অর্থ মাপার মাপকাঠি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের জাতিগত পরিচয়, অস্তিত্বের লড়াই, জীবনজীবিকা এবং পূর্বপুরুষের স্মৃতি।

ফলে ভূমির মতো এত স্পর্শকাতর বিষয়টি একপক্ষীয় বা জোরপূর্বক কোনো সিদ্ধান্ত দিয়ে স্থায়ীভাবে মীমাংসা করা অসম্ভব। এর একমাত্র পথ হলো নিরপেক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়া, প্রামাণ্য দলিলের স্বচ্ছ সত্যতা যাচাই এবং স্থানীয় বাস্তবতার মানবিক মূল্যায়ন। সরকারের গঠিত নতুন পরামর্শক কমিটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, আঞ্চলিক পরিষদ এবং তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রতিনিধিত্বকে যুক্ত করার সিদ্ধান্তটি এক অসাধারণ গণতান্ত্রিক উদ্যোগ।

এর ফলে ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় আদিবাসী ও বাঙালি প্রতিনিধিদের মতামত আনুষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব পাওয়ার পথ প্রশস্ত হলো। তবে নিশ্চিত করতে হবে যে, ভূমি বিরোধ মীমাংসার পুরো প্রক্রিয়াটি যেন কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব কিংবা প্রভাবশালী কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহলের চাপ থেকে শতভাগ মুক্ত থাকে। বিচার ও সমাধানের একমাত্র মাপকাঠি হতে হবে আইন, ঐতিহাসিক দলিল, ন্যায়বিচার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।

উন্নয়ন প্রসঙ্গে আমাদের রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিকেও নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার সময় এসেছে। পাহাড়ে হাজার কোটি টাকা খরচ করে সুপ্রশস্ত সড়ক, সুউচ্চ সেতু কিংবা ঝকঝকে সরকারি ভবন নির্মাণ নিশ্চিতভাবেই দৃশ্যমান যোগাযোগের মাইলফলক। কিন্তু এই কাঠামোগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যদি স্থানীয় সাধারণ মানুষের ভেতরের জীবনযাত্রার মান না বদলায়, যদি তাদের মৌলিক জীবনমানে পরিবর্তন না আসে—তবে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

পাহাড়ের প্রতিটি জনপদে আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষার বিস্তার, গুণগত স্বাস্থ্যসেবা, সুপেয় পানির বন্দোবস্ত, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, আধুনিক কৃষিব্যবস্থা এবং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির সুনির্দিষ্ট সুযোগ। পাহাড়ের তরুণ প্রজন্ম যদি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূলধারায় যুক্ত হতে না পারে, যদি আধুনিক প্রযুক্তির আলো ও সম্মানজনক আয়ের পথ তাদের কাছ থেকে দূরে থাকে, তবে তারা সহজেই উগ্রবাদ কিংবা সশস্ত্র চক্রের লোভনীয় ফাঁদে পা দেবে।

ফলে নিরাপত্তার নীতিকে কেবল অস্ত্রের ভাষায় না দেখে, তাকে স্থানীয় অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির কৌশলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। নিরাপত্তা ও উন্নয়ন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একটি ছাড়া অন্যটি সম্পূর্ণ অর্থহীন। কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলটি বাংলাদেশের সার্বভৌম সুরক্ষার জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ফ্রন্ট।

দুটি প্রতিবেশী দেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় দুর্গম ভৌগোলিক সুযোগ কাজে লাগিয়ে অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান, মাদক ব্যবসা ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধমূলক কার্যক্রম প্রায়শই এই অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে। এই স্পর্শকাতর সীমান্ত সুরক্ষায় প্রযুক্তি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আধুনিক নজরদারি যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি সীমান্তের আদিবাসী ও বাঙালি জনগণকে এই সুরক্ষাব্যবস্থার প্রধান অংশীদার বানাতে হবে।

কারণ, সীমান্তের বাসিন্দাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করে ও তাঁদের সুনির্দিষ্ট সহযোগিতায় নিয়ে পরিচালিত সীমান্ত সুরক্ষাই হয় সবচেয়ে শক্তিশালী ও নিশ্ছিদ্র। বহুজাতিভিত্তিক, বহুভাষিক ও বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক সহাবস্থান পার্বত্য অঞ্চলকে যে রূপ দিয়েছে, তা বাংলাদেশের রূপ রূপায়নে এক অপার সৌন্দর্য। পাহাড়ে বসবাসকারী বৈচিত্র্যময় পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীসমূহ এবং স্থানীয় বাঙালিদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

একটি প্রগতিশীল রাষ্ট্রের মহান দায়িত্ব হলো—যেকোনো নাগরিক যেন তার ভাষা, ধর্মীয় বিশ্বাস বা নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়ের জন্য বিন্দুমাত্র বৈষম্য বা নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে। সম্প্রীতি কোনো ফাঁপা সরকারি ভাষণ বা সাময়িক রাজনৈতিক সমাবেশের বিষয় নয়; মাঠপর্যায়ে নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ, সুষম অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর সমতার মাধ্যমেই এই সামাজিক সম্প্রীতির বাস্তবায়ন সম্ভব।

সরকার গঠিত এই কাঠামোর মাধ্যমে খসড়া কর্মকৌশল প্রণয়নের জন্য তিন মাসের যে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তা আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ভাঙার এক ইতিবাচক সংকেত। তবে কেবল সময়ের গতি বজায় রাখলেই চলবে না, সেই কর্মকৌশলের গুণগত মান নিশ্চিত করাটাও সমান জরুরি। এই খসড়া যেন অতীতে তৈরি হওয়া অজস্র সরকারি প্রতিবেদন বা লাল ফিতার বন্দি ভাষার প্রথাগত পুনরাবৃত্তি না হয়।

এতে থাকতে হবে সুনির্দিষ্ট বাজেট, স্পষ্ট বাস্তবায়ন সূচক, সময়সীমা এবং ব্যর্থতার দায় নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা। কারণ বাংলাদেশের মানুষ এখন আর টেবিলের ওপর স্তূপীকৃত প্রতিবেদন দেখতে চায় না; তারা দেখতে চায় মাঠপর্যায়ের দৃশ্যমান গুণগত পরিবর্তন। পাহাড়ে চিরস্থায়ী স্থিতিশীলতা ফেরাতে হলে রাষ্ট্রকে এখন একটি নতুন ও আধুনিক ভারসাম্যপূর্ণ দর্শনে হাঁটতে হবে।

একদিকে জাতীয় প্রতিরক্ষা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র থাকবে কঠোর ও আপসহীন; অন্যদিকে স্থানীয় জনগণের মৌলিক অধিকার, সামাজিক স্বকীয়তা, সংস্কৃতি, ভূমি ও উন্নয়নের অধিকার নিশ্চিতের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র হবে চূড়ান্তভাবে সংবেদনশীল ও উদার। এই দুই নীতির মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই, বরং এটিই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের আসল শক্তি।

সরকারের ১০ সেপ্টেম্বরের এই বৈপ্লবিক কাঠামো কেবল একটি প্রশাসনিক আদেশ নয়, এটি পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চিন্তাভাবনায় এক নতুন ভোরের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পাহাড়ে চিরস্থায়ী শান্তি কেবল অস্ত্রের শক্তি থেকে আসবে না, আবার স্রেফ অবকাঠামোগত প্রকল্পের মাধ্যমেও কেনা যাবে না। প্রকৃত ও টেকসই শান্তি তখনই সম্ভব, যখন নিরাপত্তার সাথে যুক্ত হবে ন্যায়বিচার, উন্নয়নের সাথে যুক্ত হবে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সাথে মিশে যাবে সাধারণ নাগরিকের ভালোবাসা ও গভীর বিশ্বাস।

পরিশেষে বলতে চাই,পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের কোনো সমস্যা বা বোঝা নয়; এটি আমাদের এক অপূর্ব প্রাকৃতিক রত্ন ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। পাহাড়ের প্রতিটি মানুষ এ দেশেরই সম্মানিত নাগরিক এবং তাঁদের ভাগ্য বাংলাদেশের ভাগ্যের সঙ্গে সুদৃঢ়ভাবে বাঁধা। নতুন গঠিত এই তিন স্তরের কাঠামো যদি তার রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে গতিশীল প্রশাসনিক দক্ষতায় রূপান্তর করতে পারে এবং সেই সিদ্ধান্তগুলোকে সাধারণ মানুষের কল্যাণে ছড়িয়ে দিতে পারে, তবে ইতিহাস বদলে যাবে।

সুতরাং আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের রক্তক্ষরণ ও অস্থিরতার অন্ধকার অধ্যায় অতীত হয়ে সেখানে উদিত হবে সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা, বৈচিত্র্যময় প্রীতি ও চিরস্থায়ী শান্তির এক নতুন সূর্য। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন। লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।