আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল টাইমস (এফটি) ‘বাংলাদেশের হারানো বিলিয়ন : চোখের সামনেই চুরি’ শীর্ষক একটি তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত ওই তথ্যে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার (২ লাখ ৩৪ হাজার ডলার বা ২৮ লাখ ৫৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা) লুট হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশ ব্যাংকও জানায়, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার এবং দেশের শীর্ষ ১০টি শিল্পগ্রুপ অর্থ পাচারে জড়িত ছিল। তাদের পাচার করা অর্থের মধ্যে ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ আদালতের মাধ্যমে জব্দ করা হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ এবং অবরুদ্ধ হওয়া সেসব সম্পদ থেকে কর দাবি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে রোববার রাতে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেলকে আহ্বায়ক করে ৭ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। প্রজ্ঞাপন অনুসারে, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদের বিপরীতে আদালতের আদেশে জব্দ (ফ্রিজ) বা ক্রোক করা (অ্যাটাচমেন্ট) ব্যাংক হিসাব থেকে সরকারের পাওনা শুল্ক ও কর আদায়ে করণীয় নির্ধারণে উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করেছে সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব আফরোজা আক্তার রিবা স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে কমিটির সদস্যসচিব করা হয়েছে এনবিআরের কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে। অর্থ পাচার এবং সম্পদ অবরুদ্ধ হওয়া শিল্পগ্রুপগুলো হলো— এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, প্রিমিয়ার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ ও আরামিট গ্রুপসহ মোট ১০টি গ্রুপ।
এনবিআরের গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ‘পাচারের শীর্ষে থাকা ব্যাংক লুটসহ ৫২ জনের নাম দুর্নীতির তালিকায় উঠে এসেছে। তাদের এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ পাচার করে গড়ে তোলা ৩৪৬টি সম্পত্তির সন্ধান মিলেছে। ’ গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার এবং ১০ শিল্পগোষ্ঠীর দেশে-বিদেশে ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ আদালতের মাধ্যমে জব্দ করা হয়েছে।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার ও ১০ শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, প্রতারণা, জালিয়াতি, মুদ্রা পাচার, কর ও শুল্ক ফাঁকি এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু হয়। এ সম্পর্কে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন বলেন, ‘শেখ হাসিনার পরিবার ও ১০ শিল্পগোষ্ঠীর কাছে থাকা সম্পদের মধ্যে দেশের মধ্যে জব্দ করা হয়েছে ৫৭ হাজার কোটি টাকা।
বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিদেশে জব্দ করা হয়েছে। ’ তবে কোন গ্রুপের কী পরিমাণ সম্পদ জব্দ করা হয়েছে, তা তদন্তের স্বার্থে প্রকাশ করেননি। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন তিনি। এনবিআরের শীর্ষ এক কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আরও একাধিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি রয়েছে, যারা সরাসরি মানিলন্ডারিংয়ে জড়িত।
বিশ্বের ৫টি দেশের ৭টি শহরে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছে ৫২ ব্যক্তি ও ৩৫৬টি প্রতিষ্ঠান। ’ অর্থ পাচার করে গড়া পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পেয়েছে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)। এনবিআর জানায়, বিশ্বের ৫টি দেশে অনুসন্ধান চালিয়ে নিশ্চিত হওয়ায় পরে শাস্তির মুখে পড়তে যাচ্ছেন এসব প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের মালিকরা।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল দেশের কয়েকটি শীর্ষ গ্রুপ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারসহ ১০টি শিল্প গ্রুপের মালিক পাচারের সঙ্গে জড়িত। পাচারের টাকায় বিদেশে গড়ে তোলা বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক তারা। পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে কাজ করছে আন্তর্জাতিক চারটি প্রভাবশালী সংস্থা। সেগুলো হলো— দ্য স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি (এসটিএআর), ইন্টারন্যাশনাল এন্টি করাপশন কো-অর্ডিনেশন সেন্টার (আইএসিসিসি), যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস ও ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর অ্যাসেট রিকভারি (আইসিএআর)।
অর্থ উদ্ধারে সম্পৃক্ত বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নগদ কোনো অর্থ দেওয়া হবে না। তবে উদ্ধার করা অর্থ থেকে কমিশন দেওয়া হবে। এনবিআর জানায়, ‘এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ পাচার করে গড়ে তোলা ৩৪৬টি সম্পত্তির সন্ধান মিলেছে। ’ বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, বিদেশে পাচার করা মোট অর্থের মধ্যে ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ আদালতের মাধ্যমে জব্দ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনার পরিবার ও ১০ শিল্পগোষ্ঠীর কাছে থাকা সম্পদের মধ্যে দেশে জব্দ করা হয়েছে ৫৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশে বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিদেশে জব্দ করা হয়েছে। সেসব সম্পদ ও অর্থ থেকে কর আদায় করতে এই কমিটি গঠন করে প্রজ্ঞাপন দেয় সরকার।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন— আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংক অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মানি লন্ডারিং বিভাগের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান কর্মকর্তা, এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিআইসি) মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সংঘটিত অপরাধ বিভাগের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি)।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বিদেশে পাচার করা সম্পদের মধ্যে আদালত কর্তৃক জব্দ ও ক্রোক করা হিসাব থেকে সরকারের পাওনা শুল্ক ও কর আদায়ে আইনগত ও অন্যান্য কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা নির্ধারণ করবে কমিটি। এ ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সুপারিশও তৈরি করে সরকারের কাছে দেবে তারা। আদেশে আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে প্রজ্ঞাপনটি জারি করা হয়েছে।
এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।


















