বাংলাদেশের অর্থনীতির চিরন্তন চালিকাশক্তি কৃষি ও কৃষক। কোটি কোটি কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রতিদিন দেশের ১৮ কোটি মানুষের অন্ন সংস্থান হয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রভাব, জীবাশ্ম জ্বালানির চড়া মূল্য এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার নানাবিধ প্রতিকূলতার মধ্যে কৃষি খাতকে টেকসই রাখা সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ও প্রগতিশীল পদক্ষেপর কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি ঘোষণা করেছেন যে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কৃষকদের সেচকাজে ব্যবহৃত ক্ষতিকর ও ব্যয়বহুল ডিজেলচালিত পানির পাম্পের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্প প্রদান করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা কেবল কৃষি খাতে একটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক জ্বালানি খাতের সংস্কার এবং একটি সবুজ, সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার রূপকল্পের বাস্তবায়ন। সংসদে মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য তাজউদ্দীন খানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া এই ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের গ্রামভিত্তিক অর্থনীতিকে এক অভূতপূর্ব জ্বালানি বিপ্লবের দিকে নিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের কৃষি প্রধানত সেচনির্ভর, বিশেষ করে বোরো মৌসুমে সেচকাজের জন্য বিশাল পরিমাণের পানির প্রয়োজন হয়। দীর্ঘদিন ধরে এ দেশে লক্ষ লক্ষ সেচপাম্প ডিজেল দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর হাজার হাজার টন ডিজেল আমদানি করতে গিয়ে যেমন বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামার ফলে আমাদের কৃষকদেরও চরম অনিশ্চয়তা ও ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়।
এর ওপর ডিজেল চালিত পাম্পের ধোঁয়া ও এসিডযুক্ত বর্জ্য পরিবেশ এবং মাটির মারাত্মক ক্ষতি করে। প্রধানমন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, পর্যায়ক্রমে দেশের সব ডিজেল চালিত পানির পাম্পকে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। এটি নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সৌরশক্তি ব্যবহারের প্রধান সুবিধা হলো এর অনন্ত উৎসের স্থায়িত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ।
বাংলাদেশে বছরের অধিকাংশ সময় প্রচুর রোদ বা সূর্যের আলো পাওয়া যায়। এই প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে কৃষিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সংযোগ ঘটানো সম্ভব হলে কৃষি উৎপাদন খরচ বহুলাংশে কমে আসবে। সেচ খরচ কমে গেলে কৃষকের লাভ বাড়বে, ফলে বাজারজাত খাদ্যের দামও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে। এটি একাধারে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং কৃষকের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে।
তবে প্রধানমন্ত্রী শুধু মুখের কথায় সীমাবদ্ধ থাকেননি, তিনি এর কারিগরি ও পরিবেশগত দিকগুলোর প্রতিও গভীর দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। সংসদ সদস্য নিপুন রায় চৌধুরীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারের ওপর জোর দেন। প্রথাগত লেড-এসিড ব্যাটারি পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ, কারণ এর ভেতরে থাকা ক্ষতিকর এসিড মাটি ও পানির সাথে মিশলে দীর্ঘমেয়াদি দূষণ ঘটায়।
সরকার লেড ব্যাটারিকে নিরুৎসাহিত করে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম ব্যাটারি প্রযুক্তি উৎসাহিত করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিকে আরও সুদৃঢ় করে। এই কৃষি-সৌর বিপ্লব বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি মূলত সরকারের সামগ্রিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি কৌশলপত্রের একটি অংশ।
২০২৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদে প্রণীত জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৌশলপত্রের এই লক্ষ্য অর্জনে রয়েছে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫,৫০০ মেগাওয়াট, ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪,৫০০ মেগাওয়াট এবং বায়ু, বর্জ্য, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সোলার ও অ্যাগ্রিভোলটেইক্স (কৃষি ও সৌরবিদ্যুতের যৌথ প্রযুক্তি) থেকে অতিরিক্ত ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের রোডম্যাপ।
কৃষকের সেচে সৌরপাম্পের বিস্তার এই মহাপরিকল্পনাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর ও জনবান্ধব পথ। পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং শিল্পের উৎপাদন সুসংহত করতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ইতিবাচক রূপরেখা উপস্থাপন করেছেন। শিল্পে গ্যাসসংকট নিরসনে সরকার নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনসহ ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি নতুন কূপ খননের বিশাল পরিকল্পনা নিয়েছে।
একই সাথে স্থলভাগ ও সমুদ্রে নতুন তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান এবং ‘বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি-২০২৬’ প্রণয়নের কাজ শুরু করা হয়েছে। পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকায় আরেকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের মাধ্যমে সরকার আকস্মিক কোনো জ্বালানি সংকট মোকাবিলার স্থায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছে। জাতীয় সম্পদের সুষম বণ্টনের ক্ষেত্রেও সরকারের সুচিন্তিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে ভোলা অঞ্চলের গ্যাস ব্যবহারের মাধ্যমে।
পাইপলাইনের দীর্ঘসূত্রতার জন্য বসে না থেকে ভোলার গ্যাসকে স্থানীয় শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, ৫০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং একটি বিশাল সার কারখানা স্থাপনে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে দেবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক ট্রেন চালু এবং ঢাকা-কুমিল্লা কর্ডলাইন নির্মাণের সমীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার খবর প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ আজ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো যুগে প্রবেশ করছে।
কৃষিতে সৌরশক্তির এই বিপ্লব কেবল একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনধারায় নিয়ে আসবে এক বিশাল রূপান্তর। ডিজেল কেনা ও পরিবহনের ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে কৃষক যখন নির্বিঘ্নে সৌরশক্তির সাহায্যে তাঁর ক্ষেতে পানি সেচ দিতে পারবেন, তখন উৎপাদনে এক নতুন গতির সঞ্চার হবে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে আজ যেখানে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে ‘গ্রিন এনার্জি’ বা সবুজ জ্বালানির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের প্রধানমন্ত্রীর এমন পরিবেশবান্ধব ও দূরদর্শী উদ্যোগ বৈশ্বিক দরবারেও দেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করবে। সুতরাং পাঁচ বছরের এই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের এক অনন্য রোল মডেল।
কৃষকের মাঠে নামবে স্বস্তি, সাশ্রয় হবে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা এবং সুরক্ষিত হবে আমাদের প্রিয় জন্মভূমির পরিবেশ। সরকারের এই বাস্তবমুখী, জনকল্যাণকর ও পরিবেশবান্ধব নীতি দেশের কৃষিতে এক অভূতপূর্ব সোনালী সূর্যোদয় ঘটাবে ইনশাল্লাহ। লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।


















