বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অনেক অপ্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। যেগুলোর বেশিরভাগই যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই প্রভাবশালীদের চাহিদার ভিত্তিতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া, অলাভজনক ও অগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
দীর্ঘদিন ধরে যাচাই-বাছাই শেষে অবশেষে অনুমোদিত এসব প্রকল্প বাতিল শুরু হচ্ছে। এরই মধ্যে একনেক সভায় অনুমোদিত একটি প্রকল্প বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) কার্যতালিকা সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।
সূত্রে জানা গেছে, আগামী সোমবার একনেক সভায় মোট ১৫টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হবে। এর মধ্যে আটটি অনুমোদনের জন্য, ছয়টি প্রকল্প অবহিত করার জন্য এবং একটি প্রকল্প বাতিলের জন্য। সভায় সভাপতিত্ব করবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও একনেক চেয়ারপারসন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
একনেক সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারের লাঠিটিলা বনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক শীর্ষক প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি গত বছরের নভেম্বরে একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়। যদিও লাঠিটিলা বনটি সংরক্ষিত হওয়ায় সেখানে সাফারি পার্ক স্থাপনের বিরোধিতা করেন পরিবেশবাদীরা। কিন্তু তাঁদের আপত্তি উপেক্ষা করে সাফারি পার্ক স্থাপনের জন্য নেওয়া প্রকল্প একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পরিবেশবাদীদের দাবি ছিল, বনের মধ্যে এ ধরনের সাফারি পার্ক নির্মিত হলে তা প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য আত্মঘাতী হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত বছর পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ভেঙে পাহাড় ও গাছ কেটে তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিনের নিজের নির্বাচনী এলাকায় বন ধ্বংসের এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিবেশবাদীদের আপত্তি উপেক্ষা করে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় সরকার। তবে সরকার পরিবর্তনের পর পাল্টে যায় পরিস্থিতি। প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। এ জন্য গঠন করা হয় চার সদস্যের একটি কমিটি।
কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে লাঠিটিলায় সংরক্ষিত বনে সাফারি পার্ক স্থাপন প্রকল্পের অনুমোদন বাতিলের সুপারিশ করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে অনুমোদিত প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় পরিকল্পনা কমিশন।
পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হলেও তখন বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। শর্ত প্রতিপালন করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করে পুনর্গঠন করে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে পুনর্গঠিত ডিপিপি পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় উদ্যোগী মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি বাতিলের সুপারিশ করে। সে অনুযায়ী প্রকল্প বাতিলের পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং বাতিলের জন্য একনেক সভায় প্রস্তাব করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুধু এই প্রকল্প নয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া, অলাভজনক ও অগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাতিল করতে যাচ্ছে সরকার, যেগুলো বাতিলের পাশাপাশি অর্থায়ন স্থগিত অথবা ব্যয় কাটছাঁট করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এর মধ্যে প্রায় ৪০টি প্রকল্প বাতিল অথবা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেগুলো ধারাবাহিকভাবে বাতিলের পাশাপাশি স্থগিত রাখার প্রস্তাব করা হবে।
এর আগে গত ১৯ আগস্ট পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া এবং কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের তালিকা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। ওই নির্দেশের পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের এ ধরনের প্রকল্পের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়।
কর্মকর্তারা বলছেন, বাতিল অথবা স্থগিতের তালিকায় প্রকল্পের সংখ্যা আরো বাড়বে। তাঁরা জানান, বিগত সরকারের সময় নেওয়া প্রকল্প তিনটি দিক বিবেচনা করে বাতিল করা হচ্ছে। এসব হচ্ছে প্রকল্পটি কতটা মানুষের প্রয়োজনে নেওয়া হয়েছে, প্রকল্প থেকে রিটার্ন কেমন আসবে এবং প্রকল্পটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কি না। শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নেওয়া প্রকল্পগুলো বাতিল হবে।
বাতিলের অপেক্ষায় থাকা প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে সুনামগঞ্জের সঙ্গে নেত্রকোনার সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে হাওরে উড়ালসড়ক নির্মাণ। সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের আগ্রহে নেওয়া প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় তিন হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের এক সভায় প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, হাওরে উড়ালসড়ক নির্মিত হলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে।
ফরিদপুর টেপাখোলা পার্ক স্থাপন প্রকল্পটিও বাতিল হচ্ছে। সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন মন্ত্রী থাকার সময় নিজ নির্বাচনী এলাকায় পার্কটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ২০১৮ সালে নেওয়া প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ১৮০ কোটি টাকা। যদিও প্রকল্পটির কাজ এখনো শুরু হয়নি। এর অর্থায়নও স্থগিত হচ্ছে। সাবেক জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের নির্বাচনী এলাকার জন্য মেহেরপুরে মেরিটাইম ইনস্টিটিউট নির্মাণের প্রকল্পটি বাতিল হচ্ছে।
এ ছাড়া নেত্রকোনায় শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়, যশোরে শেখ জহুরুল হক পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, খুলনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভো থিয়েটার এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের জন্য ছয়টি ছাদ খোলা ট্যুরিস্ট বাস সংগ্রহ প্রকল্প স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে যেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, সেগুলোর সময় না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি বাস্তবায়নে মেয়াদ থাকলেও কিছু প্রকল্পও স্থগিত করা হচ্ছে।
ঢাকার হেমায়েতপুর থেকে আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত মেট্রো রেলের সাউদার্ন রুট প্রকল্প (এমআরটি লাইন-৫) আপাতত বাদ রাখছে সরকার। এর বদলে সরকার গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত মেট্রো রেল (লাইন-২) নির্মাণে জোর দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরি গণমাধ্যমকে বলেন, প্রকল্পগুলো মাঝপথে বাতিল করা হচ্ছে। কারণ জনগণের প্রকৃত চাহিদা এবং বাস্তবায়নে সরকারের সক্ষমতা মূল্যায়ন না করেই এসব প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।