মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের ছবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা। একই ধরনের ভঙ্গি, একই পটভূমি এবং প্রায় অভিন্ন ক্যামেরা অ্যাঙ্গেলের কারণে ছবিগুলো দেখে অনেকেই এগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ছবিগুলো কৃত্রিম নয়। নির্দিষ্ট প্রটোকল মেনেই একই ধরনের ছবি তোলা হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় ট্রাম্পের সঙ্গে ছবি প্রকাশ করেন বিভিন্ন দেশের নেতা। তাদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, কসোভোর প্রধানমন্ত্রী আলবিন কুর্তি, আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামা এবং সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট আলেকসান্ডার ভুচিচও রয়েছেন।
ছবিগুলো পাশাপাশি রাখলে বেশ কিছু মিল চোখে পড়ে। প্রায় সব ছবিতেই ট্রাম্পকে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তার ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ওপরে তোলা, মুখে কাছাকাছি ধরনের হাসি এবং দুই পাশে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা ও প্রেসিডেন্টের পতাকাও রয়েছে। এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে ছবিগুলো নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। কেউ কেউ রসিকতা করে বলেন, বিশ্বনেতারা যেন ট্রাম্পের একটি কার্ডবোর্ডের কাটআউটের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছেন।
তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা. জোবাইদা রহমানের সঙ্গে ট্রাম্পের ছবির বিষয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। ওই ছবি হোয়াইট হাউজ থেকেই পাঠানো হয়েছিল এবং পরে জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয়। ছবিটিকে ভুয়া প্রমাণের চেষ্টা করতে এর সঙ্গে একটি এআই-নির্মিত ছবি যুক্ত করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকুশোর দানের সঙ্গে ট্রাম্পের একটি ছবিও একই ধরনের আলোচনার জন্ম দেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ দাবি করেন, তিনি ট্রাম্পের আসল উপস্থিতির বদলে একটি কার্ডবোর্ডের কাটআউটের সঙ্গে ছবি তুলেছেন। পরে রোমানিয়ার প্রেসিডেন্টের প্রশাসন বিষয়টি পরিষ্কার করে জানায়, ছবিটি সম্পূর্ণ আসল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশন চলাকালে ট্রাম্পের দেওয়া এক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে ছবিটি তোলা হয়।
অনুষ্ঠানে হোয়াইট হাউজের সরকারি আলোকচিত্রী উপস্থিত ছিলেন এবং তিনিই ছবিটি ধারণ করেন। মূলত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নেওয়া বিশ্বনেতাদের সম্মানে গত ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের লোটে নিউ ইয়র্ক প্যালেস হোটেলে ওই সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার ছিল না। হোটেলের লবিতে নেতাদের সঙ্গে আলাদা আলাদা ছবি তোলা হয়।
এ সময় নির্ধারিত প্রটোকল অনুযায়ী প্রত্যেক নেতাকে ট্রাম্পের পাশে দাঁড় করানো হয়েছিল। ছবির মাঝখানে ছিলেন ট্রাম্প। তার দুই পাশে রাখা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পতাকা ও প্রেসিডেন্টের পতাকা। একই স্থান, একই পটভূমি এবং প্রায় একই ক্যামেরা অবস্থানের কারণে ছবিগুলোর কাঠামো স্বাভাবিকভাবেই কাছাকাছি হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ট্রাম্পের পরিচিত শরীরী ভঙ্গি।
প্রায় প্রতিটি ছবিতেই তাকে ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ওপরে তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বিশ্বনেতাদের সঙ্গে এ ধরনের নির্দিষ্ট কাঠামোর ছবি তোলার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০১৯ সালেও একই হোটেলে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে প্রায় একই ধরনের ছবি তুলেছিলেন ট্রাম্প। আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে ছবি তোলার সময় কে কোথায় দাঁড়াবেন, তা সাধারণত প্রটোকল কর্মকর্তারাই নির্ধারণ করেন।
ফলে ভিন্ন সময়ে ভিন্ন নেতার সঙ্গে ছবি তোলা হলেও ছবির অবস্থান ও বিন্যাস একই রকম হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এর সঙ্গে ট্রাম্পের নিজস্ব শরীরী ভাষাও ছবিগুলোর মিলকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। শরীরী ভাষা বিশ্লেষক জো নাভারোর মতে, ট্রাম্প প্রায়ই একই ধরনের ভঙ্গিতে ছবি তোলেন। সোজা হয়ে দাঁড়ানো, বুক কিছুটা সামনে রাখা এবং আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি তার ছবিতে নিয়মিত দেখা যায়।
হোয়াইট হাউজের সরকারি আলোকচিত্রেও নির্দিষ্ট ধরনের ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল ও আলোর ব্যবহার দেখা যায়। ফলে আলাদা ব্যক্তির সঙ্গে তোলা ছবিতেও ট্রাম্পকে প্রায় একই অবস্থানে দেখা যেতে পারে। তবে ছবিগুলো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে পার্থক্যও ধরা পড়ে। সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট আলেকসান্ডার ভুচিচের সঙ্গে ছবিতে ট্রাম্পের বাম হাতের অবস্থান অন্য ছবির তুলনায় কিছুটা আলাদা।
তার হাসিতেও সামান্য পরিবর্তন রয়েছে। এ ছাড়া অন্য নেতাদের সঙ্গে তোলা কিছু ছবিতেও ট্রাম্পের ভঙ্গিতে পরিবর্তন দেখা গেছে। স্লোভেনিয়ার এক নেতার সঙ্গে ছবিতে তাকে করমর্দন করতে দেখা যায়। আবার মন্টেনেগ্রোর নেতার সঙ্গে তোলা ছবিতে ট্রাম্পের বৃদ্ধাঙ্গুলি নিচের দিকে ছিল এবং পাশে থাকা নেতাকেও একই ভঙ্গি করতে দেখা যায়। অর্থাৎ সব ছবি একইভাবে তোলা হয়নি।
নির্দিষ্ট প্রটোকল, একই স্থান, একই আলোকচিত্রীর ক্যামেরা এবং ট্রাম্পের পরিচিত ভঙ্গির কারণে ছবিগুলোর মধ্যে অস্বাভাবিক রকমের মিল দেখা গেছে। একই দিনে ইউরোপের একাধিক নেতা কেন প্রায় একই ধরনের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলেন, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছে রোমানিয়ার প্রেসিডেন্টের প্রশাসন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে শুধু হোয়াইট হাউজের সরকারি আলোকচিত্রীকে ছবি তোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
ছবি তোলার পর সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের কাছে প্রায় একই সময়ে পাঠানো হয়। এ কারণেই বিভিন্ন দেশের নেতারা একই দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় একই ধরনের ছবি প্রকাশ করেছেন। ফলে ছবিগুলো দেখে এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত বলে মনে হলেও বাস্তবে এগুলো নির্দিষ্ট প্রটোকল অনুসরণ করে তোলা সরকারি ছবি।























