রক্তদান করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই শরীর বুঝতে পারে, রক্তের একটি অংশ কমে গেছে। তখনই শুরু হয় ঘাটতি পূরণের প্রক্রিয়া। প্রথমে পূরণ হয় রক্তের তরল অংশ। এরপর অস্থিমজ্জা নতুন লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করে।
সবশেষে ধীরে ধীরে ফিরে আসে রক্ত তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় আয়রনের মজুত। অর্থাৎ, রক্তদান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শরীরের ‘পুনর্গঠন’ প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে যায়। প্রথমে সামলায় তরলের ঘাটতি রক্তের একটি বড় অংশই তরল, যাকে বলা হয় প্লাজমা। রক্তদানের পর শরীর প্রথমেই এই তরল অংশের ঘাটতি পূরণ করতে শুরু করে। যারা আগে থেকেই পর্যাপ্ত পানি পান করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই পুনরুদ্ধার তুলনামূলক দ্রুত হতে পারে।
তবে রক্ত দেওয়ার পর কিছু সময়ের জন্য রক্তপ্রবাহে তরলের পরিমাণ কমে যেতে পারে। ফলে কারও মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা বা ক্লান্তি হতে পারে। এ কারণে রক্তদানের পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া এবং পর্যাপ্ত পানি বা অন্যান্য তরল পান করা জরুরি। রক্ত দেওয়ার পরপরই ভারী কাজ, দৌড়ঝাঁপ বা কঠোর শরীরচর্চা না করাই ভালো। এরপর অস্থিমজ্জায় শুরু হয় নতুন রক্ত তৈরির কাজ রক্তদানের পর শরীরের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নতুন লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করা।
অস্থিমজ্জা এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। লোহিত রক্তকণিকার কাজ হলো ফুসফুস থেকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও টিস্যুতে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া। রক্তদানের ফলে এসব কোষের পরিমাণ কিছুটা কমে গেলে শরীর সেই ঘাটতি পূরণ করতে নতুন লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করতে শুরু করে। এ সময় কিছু রক্তদাতার সাময়িকভাবে ক্লান্তি হতে পারে বা আগের মতো শারীরিক পরিশ্রম করতে অসুবিধা হতে পারে।
বিশেষ করে যারা নিয়মিত কঠোর শরীরচর্চা করেন, তারা বিষয়টি বেশি টের পেতে পারেন। তবে সবার ক্ষেত্রে পুনরুদ্ধারের সময় এক নয়। বয়স, সামগ্রিক স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস, শরীরে আয়রনের মজুত এবং কত ঘন ঘন রক্তদান করা হচ্ছে—সবকিছুর ওপরই তা নির্ভর করে। তৃতীয় ধাপে পূরণ হয় আয়রনের ঘাটতি রক্তদানের পর শরীর থেকে শুধু রক্তকণিকাই কমে না, কিছুটা আয়রনও বেরিয়ে যায়।
নতুন লোহিত রক্তকণিকা ও হিমোগ্লোবিন তৈরির জন্য আয়রন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। একবার রক্তদান করলে শরীর থেকে প্রায় ২২০ থেকে ২৫০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত আয়রন কমে যেতে পারে। মাঝেমধ্যে রক্তদান করলে শরীর সময়ের সঙ্গে এই ঘাটতি পূরণ করতে পারে। কিন্তু যারা ঘন ঘন রক্তদান করেন, তাদের ক্ষেত্রে আয়রনের ঘাটতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। সমস্যা হলো, আয়রনের মজুত কমে গেলেও শুরুতে সব সময় স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না।
পরে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি বা দুর্বলতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই নিয়মিত রক্তদাতাদের প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে আয়রনের মাত্রা পরীক্ষা করানো উচিত। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে আয়রনের ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়। রক্ত দেওয়ার পর দ্রুত সুস্থ হতে কী করবেন? রক্তদানের পর শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সাহায্য করতে খুব জটিল কিছু করার প্রয়োজন নেই।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন, পুষ্টিকর খাবার খান এবং খাবারে আয়রনসমৃদ্ধ উপাদান রাখুন। রক্তদানের দিন ভারী জিনিস তোলা বা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন। মাথা ঘুরলে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা না করে বসে পড়ুন বা শুয়ে বিশ্রাম নিন। শরীর ক্লান্ত লাগলে তাকে সময় দিন। কখন সতর্ক হবেন? সামান্য মাথা ঘোরা বা অল্প সময়ের ক্লান্তি রক্তদানের পর হতে পারে।
কিন্তু মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা যদি খুব বেশি হয়, দীর্ঘ সময় ধরে থাকে বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। রক্তদান করার পর শরীর তাই থেমে থাকে না। বরং সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় ঘাটতি পূরণের কাজ। তরল পূরণ, নতুন লোহিত রক্তকণিকা তৈরি এবং আয়রনের মজুত ফিরিয়ে আনার এই তিন ধাপের মাধ্যমে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে শরীর।



















