শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে সক্রিয় হয়েছে একটি সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারক চক্র। পুলিশ সদর দপ্তরের সাইবার বিভাগের কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন করে মামলা, গ্রেপ্তার ও ক্যাম্পাসে পুলিশ পাঠানোর ভয় দেখিয়ে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’-এর মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চক্রটির বিরুদ্ধে।
ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ডজনের বেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী এ প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে অন্তত তিন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার ৮০০ টাকা এবং এক সিনিয়র শিক্ষিকার কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নগদে লেনদেনের পরপরই তাদের কাছে পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন আসে।
ফোনকারী তাদের সাম্প্রতিক লেনদেনের সময়, পরিমাণ ও স্থানসহ বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে প্রথমে বিশ্বাস অর্জন করেন। এরপর বলা হয়, যে নগদ এজেন্ট পয়েন্ট থেকে তারা লেনদেন করেছেন, সেখানে জাল টাকা লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে। ভুলবশত তাদের মোবাইল নম্বর ওই ঘটনায় যুক্ত হয়েছে বলে জানিয়ে মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয় দেখানো হয়। একপর্যায়ে ওটিপি, ক্যাশ ইনসহ বিভিন্ন কৌশলে নগদ অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়।
পরে অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। লেভেল-১ এর শিক্ষার্থী মাহবুব আহমেদ ফাহিম জানান, গত ৬ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন মিনিবাজারের ‘বিসমিল্লাহ স্টেশনারি’ থেকে নগদে লেনদেন করেন তিনি। কিছুক্ষণ পর পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয়ে এক ব্যক্তি তাকে ফোন করেন। মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে প্রথমে তার কাছ থেকে ৭ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
পরে তার মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে একইভাবে আরও ৫৩ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয় বলে জানান তিনি। লেভেল-১ এর শিক্ষার্থী মোছা. মোবাশ্বিরা মুস্তারিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন মিনিবাজারের বিসমিল্লাহ স্টেশনারি থেকে ক্যাশ আউট করার পরদিন নিজেকে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের সদস্য পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি আমাকে ফোন করেন। তিনি জানান, যে দোকান থেকে আমি টাকা তুলেছি, সেই দোকানদার একজন মহিলার বিরুদ্ধে জাল টাকা দেওয়ার অভিযোগে জিডি করেছেন।
ভুলবশত ওই মহিলার নম্বরের পরিবর্তে আমার নম্বর দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পরে জাল টাকা লেনদেনের একটি মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে আমার নগদ অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান। এরপর ওটিপি এবং নিজের নম্বরে টাকা ক্যাশ ইন করতে বলে প্রতারণার মাধ্যমে আমার অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মোট ২০ হাজার ৩০০ টাকা হাতিয়ে নেয়। লেভেল-২ এর শিক্ষার্থী সুরাইয়া আফরিন রিশাও একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
তিনি জানান, ল্যাপটপ কেনার জন্য পরিবারের পাঠানো ৬৩ হাজার ৫০০ টাকা প্রতারক চক্র ভয়ভীতি দেখিয়ে হাতিয়ে নেয়। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র শিক্ষিকার কাছ থেকেও একই কৌশলে দেড় লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতারণার শিকার হওয়া প্রায় সবাই বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন মিনিবাজারের ‘বিসমিল্লাহ স্টেশনারি’ থেকে নগদে লেনদেন করেছিলেন।
তাদের অভিযোগ, লেনদেনের পরপরই প্রতারকরা কখন, কত টাকা, কোন মাধ্যমে এবং ঠিক কত সময়ে লেনদেন হয়েছে, এসব তথ্য নির্ভুলভাবে জানিয়ে দিচ্ছে। এ কারণে ওই এজেন্ট পয়েন্টের সঙ্গে প্রতারক চক্রের কোনো যোগাযোগ রয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তারা। তবে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ‘বিসমিল্লাহ স্টেশনারি’র সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।
ফলে এ অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় প্রতারণায় ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরের বিপরীতে ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। ভুক্তভোগীরা প্রতারক চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আরফান আলী বলেন, বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।
এ নিয়ে সার্বক্ষণিকভাবে শেরেবাংলা নগর থানার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। তারাও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, এ ঘটনায় একটি জিডি হয়েছে। তদন্ত চলছে। তবে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। এদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে কেউ ফোন করে টাকা পাঠানো, ওটিপি বা মোবাইল ব্যাংকিং-সংক্রান্ত কোনো তথ্য চাইলে তা না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
একই সঙ্গে লেনদেনের তথ্য কীভাবে প্রতারকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে, তা তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।



















