ঢাকাই চলচ্চিত্রের সোনালী অতীতের সাক্ষী বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (এফডিসি)। একসময় যেখানে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশনের আওয়াজে মুখর থাকত, তারকাদের পদচারণায় মুখরিত হতো স্টুডিও পাড়া, আজ সেখানে সুনসান নীরবতা। সিনেমার শুটিং বা নতুন সৃষ্টির চেয়ে এফডিসি এখন রুপালি পর্দার মানুষদের আড্ডাস্থল আর নির্বাচনী রাজনীতির মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে, চলচ্চিত্রের মূল খোলনলচে বদলে গিয়ে এখন এর নতুন ঠিকানা তৈরি হয়েছে নিকেতন, গুলশান ও বনানী কেন্দ্রিক কর্পোরেট অফিসগুলোতে। এফডিসির ফ্লোরগুলোতে এখন আর আগের মতো বিশাল সব সেট পড়ে না। ক্যামেরা সচল হয় না মাসের পর মাস। মাঝে মাঝে কিছু নাটক, মিউজিক ভিডিও কিংবা বিজ্ঞাপনের শুটিং হলেও সিনেমার মহরত বা শুটিং এখন ডুমুরের ফুল। তবে শুটিং না থাকলেও এফডিসিতে মানুষের আনাগোনা কমেনি।
পরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীদের বিভিন্ন সমিতির কার্যালয়গুলোতে প্রতিদিন বিকেলে বসে আড্ডার আসর। এফডিসির কড়াইতলা বা ঝর্ণা চত্বর এখন সিনেমা বানানোর আলোচনার চেয়ে একে অপরের খোঁজ নেওয়া কিংবা সাধারণ গল্পগুজবেই সীমাবদ্ধ। সম্প্রতি ‘নীল চোখ’ সিনেমার মহরত অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে চিত্রনায়ক উজ্জ্বল বলেন, ‘এফডিসি এখন আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে।
এফডিসিতে যখন আমরা যাই তখন ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়। এফডিসিতে সব আছে, কিন্তু ব্যবহারকারী নেই। নতুন সিনেমা হচ্ছে, নায়ক-নায়িকা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। পরিচালক-প্রযোজকরাও আসছেন। কিন্তু কেউ এফডিসিমুখী হচ্ছেন না। সিনেমা ও হলের সংখ্যা কমেছে। ফলে সিনেমার ব্যবসা অলাভজনক হয়ে পড়েছে। এর সব কাজ হচ্ছে বাইরে। এখান থেকে বের হতে হলে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
সবাই মিলে এফডিসিতে সিনেমাতে বানাতে গেলে জায়গাটা সচল হবে। ’ চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, এফডিসি এখন সিনেমার চেয়ে ‘সমিতি’ কেন্দ্রিক রাজনীতিতে বেশি ব্যস্ত। শিল্পী সমিতি, পরিচালক সমিতি, প্রযোজক সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের নির্বাচন এলেই এফডিসি চত্বর উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কাদা ছোড়াছুড়ি, প্যানেল গঠন এবং ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা যতটা দেখা যায়, বছরজুড়ে সিনেমা নির্মাণে সেই কর্মতৎপরতার সিকিওভাগও দেখা যায় না।
অনেক জ্যেষ্ঠ চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা সিনেমা বানাতে এসেছিলাম, এখন সমিতি বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। ’ এফডিসিতে যখন স্থবিরতা, তখন ঢাকাই চলচ্চিত্রের আধুনিকায়ন ও নতুন ধারার কাজের জোয়ার এসেছে রাজধানীর নিকেতন, গুলশান ও বনানী এলাকায়। বর্তমান সময়ের আলোচিত ও ব্যবসাসফল সিনেমাগুলোর প্রি-প্রোডাকশন (স্ক্রিপ্ট রাইটিং, কাস্টিং), পোস্ট-প্রোডাকশন (এডিটিং, ডাবিং, কালার গ্রেডিং) এবং প্রযোজনা সংস্থার প্রধান কার্যালয়গুলো এখন আর এফডিসিমুখী নয়।
নতুন প্রজন্মের নির্মাতা, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং আধুনিক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো নিকেতন বা গুলশানের কর্পোরেট ও ইনডোর সেটেই তাদের সিংহভাগ কাজ সারছেন। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় শুটিংয়ের ধারণাও বদলে গেছে। বিশাল স্টুডিওর চেয়ে এখন আউটডোর লোকেশন এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ইনডোর সেটকেই নির্মাতারা বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন, যা খুব সহজেই এসব অভিজাত এলাকায় পাওয়া যায়।
চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের মতে, যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে এফডিসি নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেনি। আধুনিক ডিজিটাল সিনেমার জন্য যে ধরণের কারিগরি সহযোগিতা এবং আধুনিক পরিবেশ প্রয়োজন, তা এফডিসিতে এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। ফলে নতুন ঘরানার শিক্ষিত ও আধুনিক নির্মাতারা এফডিসির পুরোনো পরিকাঠামোর বাইরে গিয়ে নিকেতন বা গুলশানের নিরিবিলি ও পেশাদার পরিবেশে কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।
এ কথার সঙ্গে একমত হালের রায়হান রাফি, মেজবাউর রহমান সুমনদের মতো তরুণ চলচ্চিত্র পরিচালকরা। এফডিসি কেবল একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস ও আবেগের জায়গা। চলচ্চিত্র প্রেমীদের প্রত্যাশা, সমিতি আর আড্ডার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এফডিসি আবারও তার মূল রূপে ফিরবে। সরকারি অনুদানের সিনেমা কিংবা বড় বাজেটের মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের শুটিংয়ে আবারও মুখরিত হবে এর প্রতিটি ফ্লোর।
তবে তার আগে এফডিসিকে আধুনিক যুগের উপযোগী করে গড়ে তোলা এবং চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মানসিকতার পরিবর্তন আনা জরুরি।






















